আদেশের অপেক্ষায় – টোবায়াস উলফ এর ছোটো গল্প

সার্জেন্ট মোর্স তার অফিসকক্ষে বসে নাইট ডিউটি পালন করছিলেন। এমন সময় একটা কল আসলো। এক মহিলা ফোন করেছেন। মহিলা বিলি হার্ট নামক এক ব্যক্তির কথা জানতে চাইলেন।

“স্পেশালিস্ট হার্ট?” মোর্স জানতে চাইলেন, “তিনি তো এক সপ্তাহ আগেই ইরাকে চলে গেছেন”।

“আপনি নিশ্চিত? প্রত্যুত্তরে মহিলা বললেন, “সে তো এ ব্যাপারে কিছুই জানিয়ে যায়নি”।

“আমি একদম নিশ্চিত।”

“ও! একদমই জানতাম না।”

“কিন্তু……আপনি কে তা জানতে পারি?

“আমি ওর বোন”।

“আমি আপনাকে উনার ইমেইলটা দিতে পারি। একটু অপেক্ষা করুন। আমি খুঁজে দিচ্ছি।

“না। না। ঠিকাছে। আমার মতো আরো লোক হয়তো কল করার চেষ্টা করছে। আপনজনের খবর জানার জন্য তারাও হয়তো দুশ্চিন্তায় আছে।

“এক মিনিটও লাগবে না।”

“সে ঠিকাছে। তাহলে সে চলেই গেছে?”

“হুম। যে কোনো দরকারে ফোন করবেন নির্দ্বিধায়। যদি কোনো সহায়তা করতে পারি!”

“হাহ”, ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহিলা ফেলে ফোন রেখে দিলেন। সার্জেন্ট মোর্স আবার কাগজপত্রের দিকে মনোযোগ দিলেন। কিন্তু বিলি হার্টের ব্যাপারটা তার মনে খচখচ করছিলো। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। ওয়াটার কুলারটার সামনে গিয়ে এক গ্লাস পানি খেলেন। এরপর আরেক গ্লাস ভর্তি করে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাতের আবহাওয়াটা বেশ গরম আর কেমন যেনো গুমোট ধরানো। তখন যদিও মাত্র পৌনে এগারোটা বাজে। ব্যারাকটা বেশ নিরিবিলি। কিছু কিছু জানালা দিয়ে আলোর ছটা দেখা যাচ্ছিল। একটা ধূসর রঙের পোকা পর্দার আশেপাশে অস্বাভাবিকভাবে উড়াউড়ি করছিলো।

মোর্স বিলি হার্টকে তেমনভাবে চিনতেন না। কিন্তু তার খবর জানতেন। হার্ট অ্যাশভিলের পাহাড়ী অঞ্চলের লোক। সে সবসময় তাড়াহুড়ো করে কাজ করতো। পোকার খেলতো আর নতুন লোকদের ঠকিয়ে উঠতি আয়ের ব্যবস্থা করতো। তাছাড়া তার ঘোড়ার গাড়ির ব্যবসাও ছিলো। এ সকল কাজের সাথে জড়িত থাকলেও তাকে কখনো পাকড়াও করা যায়নি। সে ভাবতো—কেউই কিছু জানেনা। এটা তার মুখের ছোট্ট হাসি দেখেই বুঝা যেতো। মাঝেমধ্যে সে ভুরিভোজ করতো। একা একাই। বিলি হার্টের মতোন লোকদের জন্য এখানে অনেক সুযোগ সুবিধা আছে।

সে দেখতে ছিলো সত্যিকারের সৈন্যদের মতোই। কিছুটা ইন্ডিয়ানদের মতোন চওড়া চিবুক আর গভীর কালো চোখের সুদর্শন বিলি হার্ট ছিলো বিড়ালের মতো শান্ত। সে হাঁটার সময় মনে হতো অবসন্ন কোনো এক লোক অবজ্ঞাভরে কোনো এক জায়গায় যাচ্ছে, অনিচ্ছাসত্ত্বেও। সে পা ফেলতো বেশ আলগাভাবে। বিলির সামনে সবসময় আঁটোসাটো হয়ে থাকতো মোর্স, কারণ সে জানতো যে বিলি হার্ট আসলে সমস্যার দূত। বিলির চোখ আর হালকা হাসি দেখে তার মনে হতো সে বুঝি তার গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তি দিয়ে তার মনের খবর সব পড়ে নিচ্ছে।

তবে বিলি যে বন্ধুত্বপরায়ণ ছিলো সে ব্যাপারে মোর্স নিশ্চিত। তার সাথে থাকলে মোর্স হয়তো অনেক সুবিধা পেতো। তাছাড়া দুজনের পছন্দের বিষয়গুলোতেও মিল আছে। কিন্তু সে সুযোগ মোর্স নেয়নি। কারণ হয়তো তার ঠকবার ভয় ছিলো। আর এখন? এটা সম্ভবই নয়।

জীবনের উনচল্লিশ বসন্তের বিশটাই এই আর্মিতেই কাটিয়েছে মোর্স। ব্যাপারটা এমন না যে আর্মিতে থেকে সে খুব খুশি। কিন্তু তাকে আর্মিতেই মানায় আর সে ঐসকল লোকদের মতো যাদের দ্বারা যে কোনো কাজ করানো যায়-কাজের প্রতি আগ্রহ বা ভালোবাসা থাকুক আর নাই থাকুক। সে ছিলো পুরোদস্তুর সৈনিক। নিজেকে সে সাধারণ জনগণের মতো কল্পনাই করতে পারে না; ঐ জীবনে কোনো নিয়মনীতির বালাই নেই, আর ঐ জীবনের সিদ্ধান্তগুলো খুবই তুচ্ছ প্রকৃতির।

নিজের অবস্থান সম্পর্কে মোর্সের ভালো ধারণা আছে। কিন্তু তারপরও সে বিভিন্ন কেলেংকারীতে জড়িয়ে পড়তো মাঝে মাঝেই। ইরাক ভ্রমণের কিছুকাল আগে, একটা রেস্টুরেন্টে এক কিউবান বেয়ারার সাথে তার পরিচয় হয়। এই বেয়ারা বিবাহিত, জুয়ার নেশাগ্রস্ত, এবং অবশেষে মোর্স জানতে পারলো যে সে একজন ব্ল্যাকমেইলার। তবে মোর্স ব্ল্যাকমেইলড হতো না। সে তার কমান্ডিং অফিসারের নাম আর ফোন নাম্বার দিয়ে বলেছিলো, “এই নাও। এই নাম্বারে কল দাও”। যদিও তার মনে হয়নি যে লোকটা কখনো ফোন করতে পারে, তবু পরের দুটো সপ্তাহ সে বেশ দ্বিধার মধ্যে ছিলো। এরপর সে ফিরে আসে তার আগের জীবনে, পরবর্তী উত্তেজনাকর দিনগুলোর জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণতে থাকে।

পরবর্তী উত্তেজনাটা এলো এক তরুণ লেফটেনেন্ট”এর কাছ থেকে। যে সপ্তাহে মোর্স ফিরে আসে সে সপ্তাহেই ঐ তরুণ লেফটেনেন্ট তাদের ইউনিটে যোগদান করে। দুজনেই ওরিয়েন্টেশনে গিয়েছিলো। মোর্স টের পেলো যে তরুণটি তার দিকে কিছুটা আকৃষ্ট। প্রথমদিকে তরুণটি নিজেও হয়তো তার এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলো না। এমনকি যখন মোর্সের কাছে নিজের ভালো লাগার কথা স্বীকার করছিলো, তখনও নয়। এর সাথে আবার যুক্ত হয়েছিলো গোপন জায়গা আর গোপন সময় খুঁজে না পাবার ভয়। ছেলেটা নিজেকে আবিষ্কার করছিলো, আর সে পথে হাঁটতে গিয়ে নিজের ওপর লজ্জা আর ঘৃণাও অনুভব করছিলো। মাঝে মাঝে তার এই আত্মঘৃণাটা এতো তীব্র হয়ে উঠতো যে মোর্সের মনে হতো ছেলেটা নিজের কোনো ক্ষতিই করে ফেলে কিনা, অথবা সেই ক্ষোভের প্রতিশোধ মোর্সের ওপরেই তুলতে চায় কিনা। কে জানে, কোনো এক আসরে মদ খেয়ে সবার সামনেই সবকিছু বলে ফেলে কিনা!

কিন্তু ব্যাপারটির মোড় ঘুরে গেলো অন্যদিকে। তারা যখন টহলে ছিলো তখন ঐ তরুণ লেফটেনেন্ট এক-কানওয়ালা একটা বিড়াল দত্তক নেয়। বিড়ালটি তার পায়ের গোড়ালিতে আঁচড় দেয়। আর ঐ জায়গায় ইনফেকশন হয়ে যায়। তারপরো সে চিকিৎসা না নিয়ে বোকার মতো এমন পা নিয়েই খেলাধূলা চালিয়ে গেছে। যার কারণে গ্যাংগ্রিন হয়ে যায়। ফলস্বরুপ তার পা কেটে ফেলতে হয়। এই অভিযানের পাঁচ মাসের মাথায় তাকে বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে মর্মাহত না হয়ে বরং স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলো মোর্স।

আসলে স্বস্তিরও তেমন অবকাশ ছিলো না। ওখান থেকে ফেরার পর ওই তরুণ লেফটেনেন্ট এর এলাকা থেকে দুজন সিভিলিয়ান ব্যাক্তি তাকে জেরা করার জন্য আসে। এজন্য তাকে সদর দপ্তরে ডেকে নেয়া হয়। ওই দুজন তার সাথে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করেছিলো। যদিও একই প্রশ্ন বারবার জিজ্ঞেস করে জানতে চাইছিলো তার সাথে ওই লেফটেনেন্টের পরিচয় কেমন ছিলো। মোর্স তেমন কিছুই জানায়নি, যদিও সে সাহায্যপূর্ণ ভাব দেখানোর চেষ্টা করছিলো। সে দেখলো তারা যেখান থেকে এসেছে সেখানকার কংগ্রেসম্যানের এ ব্যাপারে হাত আছে। ব্যাপারটি বেশ স্পর্শকাতর। তাদের ঐ লেফটেনেন্টের ইরাক যাত্রা, সেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে তার ভূমিকা আর অন্যান্য বিষয়ের ব্যাপারেও ধারণা রেখেছেন। তারা আবার কয়েক সপ্তাহ পর আবার তার সাথে দেখা করবে বললেও শেষ মুহূর্তে মানা করে দেয়। তবুও মোর্স তাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করেছিলো।

মোর্স ভাবে, ইস, তার আকাঙ্ক্ষাগুলো যদি এমন হতো যাতে তাকে এত সমস্যায় না পড়তে হতো। কিন্তু সে জানে, ভাগ্যবান ছাড়া এমন মিল হয় না। তারপরেও সে আশা আঁকড়ে ধরে রাখে।

গত কয়েক মাস ধরে মোর্স ইন্টেলিজেন্স বিভাগের এক মাস্টার সার্জনের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। তার চেয়ে বছর পাঁচেক বড়ো-বেশ শান্ত স্বভাবের আর চেহারাতে ছিলো পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাব। যদিও মোর্স নিজেকে কাউকে নিজের পার্টনার হিসেবে ভাবতে পারে না, তবু সে ধীরে ধীরে এন.সি.ও. তে নিজের কোয়ার্টারে রাত আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো কাটানো বন্ধ করে দেয়, চলে যায় ডিক্সনের টাউন হাউজে। রুমটাতে ডিক্সনের নানান অভিযান আর ভ্রমণে সংগ্রহ করা মালামালে ঠাসা। প্রাচীন অদ্ভুত দেখতে মুখোশ, অস্ত্র, স্টাফ করা জানোয়ার –এইসব। প্রথম প্রথম জাদুঘর ঘরানার বলে মনে হলেও একসময় মোর্সের তা সহ্য হয়ে যায়। এখন বরং এ সকল জিনিসপত্রের পাশাপাশি থাকতে ভালোই লাগে।

কিন্তু ডিক্সনের বিদেশে ঘুরাঘুরি আর মোর্সের সৈন্যদলে নিজস্ব কাজ তাদের সম্পর্ককে জটিল করে তোলে। তাদেরকে শীঘ্রই নিজেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরস্পরের প্রতি কতটুকু অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবে তাও জানানো লাগবে। এ সবের শেষ কোথায় মোর্স তা জানেনা। কিন্তু এসব তো এভাবেই চলছে।

——————————————————————

মধ্যরাতে অন্য এক সার্জেন্টের কাছে কাজ বুঝিয়ে দেয়ার আগমুহুর্তে বিলি হার্টের বোন আবার কল করলো। মহিলার কণ্ঠস্বর চিনতে পেরে দরজার দিকে ইশারা দিতেই অন্য লোকটি স্মিত হেসে বেরিয়ে গেলো।

“আপনি কি ঠিকানা চান তাহলে?”, মোর্স জিজ্ঞেস করলো।

“জ্বি। সেটা হলে ভালো হয়”।

মোর্স আগেই ঠিকানাটা বের করে রেখেছিলো। আর এখন তা পড়ে শোনালো।

“ধন্যবাদ”, মহিলা জানালো, “আমার কাছে কোনো কম্পিউটার নেই। কিন্তু স্যাল”এর আছে। “

– স্যাল?

– স্যাল ক্রোনিন। আমার কাজিন।

– আপনি তো যে কোনো ইন্টারনেট ক্যাফেতেও যেতে পারেন।

“হুমম……তা ঠিক”, সন্দেহের কণ্ঠে বললো মহিলা, “আপনি… মানে আপনি কি এ ব্যাপারে আমাকে সহায়তা করতে পারবেন?”

-আসলে আমি ঠিক জানি না।

-আপনি তো তাও বলেছেন।

-হুম। আর আপনি সেই প্রস্তাবে হেসেছেনও।

-ওটা আসলে হাসি ছিলো না।

-ওহ! হাসি ছিলো না?

-আমি নিশ্চিত নই, বোঝাতে চেয়েছিলাম।

মোর্স অপেক্ষা করলো।

“দুঃখিত”, মহিলা বললো, “দেখুন আমি কোনো সাহায্য চাচ্ছি না, ঠিক আছে? কিন্তু আপনি সাহায্য করতে চেয়েছিলেন কেন, সেটা নিয়ে একটু কৌতুহল আর কী!”“

-কোনো কারণ নেই। ঠিক কোনো কিছু ভেবে বলিনি।

-আপনি বিলির বন্ধু?

-ভালোই লাগে ওকে।

-বাহ, শুনতে ভালো লাগলো। কথাটা শুনতে আসলেই চমৎকার।

————————————————————————-

সেদিন অফিসের শেষে, মোর্স একটা প্যানকেকের দোকানে গেলো মহিলার সাথে দেখা করতে। এই দোকান থেকেই মেয়েটা কল করেছিলো। আগে বলে রাখা কথা অনুযায়ী, মহিলা ক্যাশ রেজিস্টারের পাশে দাঁড়িয়েছিলো। দরজা খুলেই মোর্স তাকে দেখতে পেলো। মহিলাটি প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ালো। মোর্স দেখলো বিলির বোন বেশ লম্বা, প্রায় তার মতোনই। আর চুলগুলো কালো, কোঁকড়ানো। মুখে কিছুটা ক্লান্তির ছাপ, চোখ দুটো কালো-গভীর। এছাড়া বিলের সাথে আর কোনো মিলই পেলো না মোর্স। কেন জানি হঠাৎ মোর্স হতাশ হয়ে গেলো আর এখান থেকে দ্রুত চলে যাবার একটা তাগিদ অনুভব করলো।

মহিলা মোর্সের দিকে এগিয়ে এলো। মাথাটা একপাশে হেলিয়ে যেন পর্যবেক্ষণ করছে মোর্সকে। তার চোখের ভ্রু বেশ বড় আর ঘন ছিলো। পরনে ছিলো একটা হাতাকাটা ব্লাউজ।

“আমার কি আপনাকে সার্জেন্ট সম্বোধন করা উচিৎ?” মহিলা জিজ্ঞেস করলো।

-ওয়েন।

-সার্জেন্ট ওয়েন।

-শুধু ওয়েন বললেও চলবে।

“আচ্ছা, ওয়েন”, বিলির বোন বললো। সে তার হাত সামনে বাড়িয়ে দিলো। হাতটা শুকনো এবং রুক্ষ। “আমি জুলিয়েন, আমাদের জায়গা ঐ কর্নারে।”

সে তাদেরকে একটা বড়ো জানালাওয়ালা পার্কিং লটে পাশের বুথে নিয়ে গেলো। সাত/আট বছরের একটা মোটামুখো বালক বসে বসে পেইন্টিং করছিলো, তার সামনে সসেজ, কেক, ডিম এর অবশিষ্টাংশ সহ একটা প্লেট পড়ে আছে।

সে হাতের রঙ্গিন খড়িটাকে গজালের মতো ধরলো যখন মোর্স তার পাশের বেঞ্চের সামনে আসলেন। বিলির বোনকে দেখেও একই আচরণ করলো। মোর্সের দিকে একটা লম্বা চাহনি দিয়ে সে নিজের কাজে আবার ডুবে গেলো।

“হ্যালো বলো, চার্লি”, জুলিয়েন বললো।

সে একবার পেইন্টংটাতে আঁচড় দিলো, আর এরপর বললো, “কী অবস্থা?”

“সে এখন আর হ্যালো বলে না। তার বদলে “কী অবস্থা” ব্যবহার করে। কোত্থেকে শিখেছে কে জানে!” জুলিয়েন বললো।

“এইতো চলছে। আশা করি ভালোই আছো, চার্লি। তোমার কী অবস্থা?” মোর্স বললো।

“তোমাকে দেখতে ব্যাঙ এর মতো লাগছে”, ছেলেটি বললো। সে আরেকটা রঙ্গিন খড়ি তুলে নিলো।

“চার্লি”, বাজে ব্যবহার করো না”, পাশে একটা ওয়েইট্রেসের কফি ঢালা দেখতে দেখতে মহিলাটি বললো।

“না। না। ঠিকাছে”, মোর্স বলে উঠলো। সে জানতো এমন কিছু একটা ঘটবেই। এজন্য না যে তার মুখ আসলেই ব্যাঙের মতোন কিন্তু তার চোয়াল কিছুটা মোটা বটে।

“এই মহিলাটার সমস্যাটা কী?” জুলিয়েন বললো। কারণ ওয়েট্রেস মহিলাটি সারা ঘরময় শুধু শুধু পায়চারি করছিলো। এরপর জুলিয়েন তাকে চোখে ইশারা দিলে সে ধীরে তাদের টেবিলে এসে জুলিয়েনের কাপে কফি ঢেলে দিলো।

“সেরকম আঁকাআঁকি হচ্ছে, তাই না?” ওয়েট্রেসটি জিজ্ঞেস করলো, “কী আঁকছো?”

ছেলেটি পাত্তা দিলো না। এরপর ওয়েট্রেসটি মোর্সকে বললো, “বাহ, বেশ ভালো আর্টিস্ট পয়দা করেছেন দেখছি।” এরপর সে চলে গেলো।

জুলিয়েন তার কফিতে দীর্ঘ সময় ধরে চিনি ঢাললো।

“চার্লি কি তোমার ছেলে??”

বিলির বোন চার্লির দিকে একটু আড়চোখে তাকালো, “না”।

“তুমি আমার মা না”, বিড়বিড় করে বললো ছেলেটা।

“সেটাই তো বলেছি, নাকি?”, তিনি তার হাত দিয়ে গাল মুছলেন, “ছবি আঁকতে থাকো, আমাদের কথায় নাক গলাতে হবে না”। এরপর মোর্সকে জিজ্ঞেস করলেন, “বাচ্চাকাচ্চা আছে?”

“এখনো নয়”। ছেলেটি ভয়ানকভাবে নীল রঙের লাইন আঁকছিলো যেন কোনো বিশেষ কাজের তাড়া আছে।

“না থাকাতে আপনার কোনো ক্ষতিই হচ্ছে না।”

“আমার তো উল্টোটা মনে হচ্ছে।”

“বেয়াদবি আর নোংরামিকে যদি ক্ষতি মনে না করেন, তাহলে আর কি। চার্লি বিলির ছেলে, বিলি আর ডায়নার”, জুলিয়েন বললো।

“আমি জানতাম না, বিলির ছেলে আছে”, সে কথাটা এমনভাবে বলতে চাইলো যাতে অভিযোগের মত না শোনায়, যদিও সে জানতো যে তার কণ্ঠে অভিযোগের ছাপটা স্পষ্ট। সে আশা করলো মহিলা এ ব্যাপারে বেশি ঘাঁটাঘাটি করবেন না।

“তার আচরণ দেখে মনে হতো যে সে নিজেও জানতো না। বিলিও না, ডায়নাও না,” জুলিয়েন বলে চললো, ডায়না নাকি দ্বিতীয়বারের মত মাদকাসক্তি থেকে নিরাময়ের জন্য রালেই শহরের পুনর্বাসন কেন্দ্রে গেছে। জুলিয়েন আর বেলা চার্লির দেখাশুনো করছেন। মোর্স বুঝলো, বেলা হচ্ছে জুলিয়েনের মা। কিন্তু ওদের মিলমিশ হয়নি বেশিদিন। বেলা ফ্লোরিডা চলে যায় তার এক বয়ফ্রেন্ডের সাথে। এতে করে বিপদের সাগরে পড়ে জুলিয়েন। বাঁচার তাগিদে সে একটা স্কুল বাসের ড্রাইভারের চাকরি নিলো, আবার গ্রীষ্মের স্কুল ছুটিতে গার্লস স্টুডেন্ট ক্যাম্পে বাবুর্চির চাকরিও করেছে। কিন্তু চার্লিকে সঙ্গে নিয়ে –তার উপর বাচ্চাটার খেয়াল রাখার জন্য টাকা পয়সা না থাকাতে সে ক্যাম্পের চাকরি ছেড়ে দেয়।

এ কারণেই সে এখানে এসেছে, স্কুলের ছুটি শেষ হবার আগে বিলি কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারে কিনা দেখার জন্য। অথবা যদি কোনোভাবে বেলা এসে কিছু খরচাপাতি দেয়, সেটা যাচাই করার জন্য!

মোর্স ছেলেটির দিকে তাকালো। এ ধরনের কথাবার্তা তার তেমন পছন্দ না। তাই তেমন মনোযোগও দিতে পারলো না। কিন্তু জুলিয়েন বলেই চলেছে যেন সে মোর্সের ভাবভঙ্গি লক্ষ করছে না। তার কণ্ঠটা নীচু ধরনের। অনেকটা করাত দিয়ে কাঠ কাটলে যেমন শব্দ হয় তেমন।

জুলিয়েনের এই সব গান মোর্সের ঠিক সয় না। জুলিয়েন তবু তার ফ্যামিলির ফাঁকফোকর আর সমস্যার কথাই বলে গেলো। তাছাড়া সে নিজেদের খামার নিয়ে আশান্বিত। সে এমন সব লোকেদের কথা বলতে লাগলো যেন মোর্সও তাদেরকে ওইভাবেই চিনে। মোর্স প্রথমদিকে চাইলো মহিলা নিজ থেকে তার প্রতি আগ্রহ দেখাক। কিন্তু তা হলো না। সে বুঝতেই পারলো না ঠিক কী চায় এ মহিলা তার কাছে, কেন চায়! সে এটাও বুঝতে পারলো না যে সে নিজেই বা কেন আজ এখানে আসতে রাজি হলো!

“তাহলে সে চলেই গেছে”, সে বললো, “অবশেষে। আপনি নিশ্চিত?

-হুম। মনে হয়

“আমার ভাগ্য ভালোই চলছে তাহলে। এর চেয়ে খারাপ হলে আর রক্ষে থাকবে না।” সে পেছনদিকে হেলান দিলো আর চোখ বুজলো।

-আপনি আরো আগে ফোন করেননি কেন?

-কী? আপনি আমাদের বিলিকে চিনেনই না তাহলে।

জুলিয়েন একটা ঘোরের মধ্যে পড়লো এবং শীঘ্রই মোর্সেরও তাই হলো। একসময় বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো আর অস্পষ্ট কণ্ঠস্বরেরা এলোমেলোভাবে ঘরময় ছড়াতে লাগলো। তারা জানেনা ঠিক কতক্ষণ ওখানে বসে ছিলো। মোর্সের নিমগ্নতা ভেঙ্গে গেলো বৃষ্টির ছিটার কারণে। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়তে লাগলো। একসময় বৃষ্টি থেমে গেলো। তারপর হঠাৎ লোকজনের হুড়াহুড়ি, পিচঢালা রাস্তায়-ভিজে পার্কিং লটের দিকে সবাই এগিয়ে গেলো। দেখতে বেশ লাগলো। বিশেষ করে কর্মময় একটা দিনের পর।

“বৃষ্টি” মোর্স বললো।

জুলিয়েন তাকানোর কোনো চেষ্টা করলো না। সে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু নড়াচড়া দেখে বুঝা যায় যে সে আসলে ঘুমায়নি। মোর্স পাশের টেবিলে বসা তার কোম্পানীর দুজন লোককে দেখলো। মোর্স তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলো যতক্ষণ না তারা ফের তার দিকে তাকায়। তারা তাকালে পর মোর্স মাথা নোয়ালো। তারাও মাথা নুইয়ে সম্মান জানালো।

ব্যাংকে রাখা টাকাগুলোর কথা ভাবছে এখন মোর্স। একসময় একটা স্ত্রী, এক ছেলে সহ সে হয়তো প্যানকেক হাউজে থাকতে পারতো। কিন্তু, না। এ ধরনের চিন্তা তাকে মানায় না। তাছাড়া এখানে একটা ফ্যামিলির প্রতিচ্ছবি কল্পনা করা অসম্ভব। কিন্তু আসলেইতো একটি পরিবারের মতো সবকিছু আছে এখানে—জুলিয়েন চোখ বুজে বসে আছে—ছেলেটা তার পেইন্টিং নিয়ে মগ্ন আর মোর্স—নিজেকে একজন স্বামী বা অভিভাবক হিসেবে কল্পনা করলো নিজেকে।

“তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে”, মোর্স আপনি থেকে তুমিতে নামলো।

তার কণ্ঠস্বরের আশ্চর্য কোমলতা তাকে অবাক করলো এবং চোখ এমনভাবে কাঁপলো যেন জুলিয়েনও অবাক হয়েছে। জুলিয়েন তার দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে দেখলো। মোর্সের হঠাৎ মনে হলো ঐদিন ফোনে দয়া করে কোমল স্বরে কথা বলার জন্যই হয়তো জুলিয়েন কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরুপ এখানে দেখা করার কথা বলেছে।

“আমি সবসময় এমনই ক্লান্ত থাকি”, সে বললো।

-জুলিয়েন, এই ঝড় সামলাতে তোমার কেমন টাকাপয়সা লাগবে?

-না, বাদ দাও। আমি শুধু কথাগুলো বলে মনের ঝাল মেটাচ্ছিলাম।

-আমি সম্প্রদান কারকে দানের কথা বলছিনা। ঠিকাছে? ধার দিচ্ছি, আর কিছুই না।

-সব ঠিক হয়ে যাবে।

“এমন তো না যে আমার টাকার জন্য কেউ লাইন ধরে আছে”, মোর্স বললো। আর কথাটা সত্যি! তার বাবা আর বড় ভাই অবশেষে ইংগিতটা ধরতে পেরেছে, এখন আর ওরা যোগাযোগ করে না। ইরাক থেকে ফেরার পর মায়ের সাথে থাকতে চেয়েছিলো মোর্স। কিন্তু সে আসার কিছুদিন পরেই মা মারা যায়।

মোর্সের নতুন উইলে, তার মা যেখানে জীবনের শেষ সপ্তাহগুলো কাটিয়েছে, সেখানে সব দান করে দেবে বলে ঠিক করেছে। ডিক্সনকে সব দিয়ে যেতে পারতো, কিন্তু তাতে অনেকের অনেক কটাক্ষ সহ্য করতে হতো। যাই হোক, ডিক্সনের নিজেরই বেশ ভালো পরিমাণের টাকা ছিলো।

“তা পারবো না”, জুলিয়েন বললো, “কিন্তু আপনি বলেছেন, এতেই আমি খুশি”।

“আমার বাবা একজন সৈনিক”, ছেলেটি বলে উঠলো। তার মাথা এখনো ম্যাটের নীচেই।

“আমি জানি”, মোর্স বললো, “খুব সাহসী সৈনিক, গর্ব করার মত।”

জুলিয়েন তার দিকে চেয়ে হাসলো। সত্যিকারের হাসি। সে রাতের জন্য প্রথমবার। সে এমনভাবে মুখ চেপে হাসলো যেন অন্য কেউ হাসছে। মোর্স দেখলো তার মধ্যেও সৌন্দর্য রয়েছে। তাছাড়া তার প্রতি জুলিয়েনের আস্থা ওর সৌন্দর্যের পাঁপড়ি মেলে ধরতে সাহায্য করেছে। মোর্স কিছুটা বিব্রতবোধ করলো। সে হঠাৎই নিজের মধ্যে একটু দ্বৈতভাব অনুভব করলো আর অপ্রস্তুতভাবে বলে উঠলো, “আমি তো জোর করতে পারি না। তোমার যা ভালো মনে হয়, করো।”

হাসিটা মুহুর্তেই গায়েব হয়ে গেলো। “আমি চেষ্টা করবো”, জুলিয়েন বললো। সেই একই স্বরে যে স্বরে মোর্স বলেছিলো। “যা হোক। আমার আপনাকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত”, এরপর ছেলেটিকে বললো, “চার্লি, দেরি হয়ে যাচ্ছে, তোমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও”।

-আমার এখনো কাজ শেষ হয়নি।

-আগামীকাল শেষ করো তাহলে।

মোর্স জুলিয়েনের উঠার জন্য অপেক্ষা করলো। আর ছেলেটিকে তার জিনিসপত্র গুছাতে সাহায্য করলো। এরপর লবণ রাখার পাত্রের মধ্যে বিল সাঁটানো দেখলো এবং তা তুলে নিলো।

“বিল আমি দেবো”, জুলিয়েন বললো।

এমনভাবে হাতটা বাড়ালো যে না দিয়ে পারা গেলো না। মোর্স অপ্রস্তুতভাবে দাঁড়িয়ে রইলো যখন জুলিয়েন বিল মিটাচ্ছিলো। তারপর সে দুজনের সাথে একসাথে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে শামিয়ানার নীচে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ওরা। বাইরে প্রচণ্ড ঝড় বৃষ্টি চলছে। তারা পার্কিং লটে চলা ঝড়ের তাণ্ডব অনুভব করলো। বৃষ্টির অস্পষ্ট ফোঁটা তাদের মাথার উপর ল্যাম্পপোস্টে ঝিলিমিলি আলো তৈরি করলো। চারপাশের গাছপালাগুলো প্রচণ্ডভাবে হেলছে দুলছে। রাস্তার পিচের উপর বাতাসের ঢেউ খেলা করলো যেন।

জুলিয়েন ছেলেটির কপালে হাত বুলিয়ে চুল সরিয়ে দিলো। এরপর বললো, “আমি রেডি। তুমি?”

-না।

“আচ্ছা। চার্লস ড্রু হার্টের জন্য তো এখন বৃষ্টি পড়া থামবে না”, জুলিয়েন হাই তুলতে তুলতে বললো। মোর্সের দিকে তাকিয়ে বললো, “আপনার সাথে কথা বলে বেশ ভালো লাগলো।”

“তুমি কোথায় থাকবে?”, মোর্স জিজ্ঞাসা করলো।

-পিক আপে।

-পিক আপে? তুমি ট্রাকে ঘুমাবে?

“এই আবহাওয়ায় চালাতে তো পারবো না, তাই!” যে দৃষ্টি জুলিয়েন তার দিকে হানলো, তার কিছুটা প্রত্যাশিত আর বাকিটা বিদ্রুপাত্মক। মোর্স জানতো যে জুলিয়েন বুঝে ফেলেছে যে সে ওদেরকে একটা মোটেল রুমে থাকবার প্রস্তাব দিতে পারে। সে এটাও বুঝতে পারছিলো যে জুলিয়েন ইতোমধ্যেই সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মানসিক শান্তি লাভের জন্য মুখিয়ে আছে। কিন্তু মোর্স তাতে দমে গেলো না, প্রস্তাবটা দিয়েই ফেললো।

——————————————————

“গ্রাম্য গর্ব”, ডিক্সন বললো সব শোনার পর, “তোমার ওদেরকে এখানে নিয়ে আসা উচিত ছিলো। এখানে থাকতে পারতো ওরা”। “বিশেষ করে পাহাড়ী অঞ্চলের লোকেরা এটা পছন্দ করে”, ডিক্সন বলে চললো, “আরবদের মতো। আতিথেয়তা পছন্দ করে, কিন্তু টাকা নিতে চায় না। আতিথেয়তা একটা পবিত্র কাজ। অতিথি গ্রহণ করতে অস্বীকার করতে পারবে না, আবার আতিথেয়তা করতে চাইলে অস্বীকৃতিও জানাতে পারবে না।”

“ব্যাপারটা এমন করে কখনো মাথাতেই আসেনি”, মোর্স বললো। কিন্তু সত্যিটা হলো তার নিজেরও এমনই মনে হয়েছিলো, যখন হাতে ওয়ালেট নিয়ে ও দুজনের সাথে রেস্তোরাঁর বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। যদিও সে ঝড়ের অজুহাতে, বাচ্চাটাকে শুকনো ও নিরাপদে রাখার অজুহাতে জুলিয়েনকে একটা রুম ভাড়া নেয়ার জন্য টাকা দিতে চেষ্টা করেছিলো, সে জানতো জুলিয়েনকে নিজের বাসায় আসতে বললে সে না করতো না। কিন্তু তারপর?

ডিক্সনের ঘুম ভাঙ্গাতে হতো। নতুন তোয়ালে বের করে গেস্ট রুমে দিতে হতো। কফি বানাতে হতো। ডিক্সন বাচ্চাটার সাথে খুনসুটি করতো—এবং এমনভাবে মোর্সের দিকে তাকাতো যেভাবে সে সবসময় তাকায়। আর এটার মানে জুলিয়েনের কাছে জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে যেতো। হয়তো সে ভিতরে ভিতরে ভয়াবহ আশ্চর্য পেতো, বিরক্তও হতো। ভাবতো তার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। মোর্স এমনটাই ভেবেছিলো, কিন্তু সেটা ভেবে ভয়টয় পায়নি। সে মেয়েটাকে পছন্দ করতো। তার মনে হয়নি যে সে খারাপ আচরণ করতো। বরং যেটা সে ভয় পাচ্ছিলো অথবা মেনে নিতে পারছিলো না, তা হলো – ডিক্সন যেমন করে ওর দিকে তাকায়, সেটা যাতে জুলিয়েন দেখে না ফেলে। জুলিয়েন মোর্সকে যা দিতে চায়, মোর্স জুলিয়েনকে তা কখনোই দিতে পারবে না, এটা সে জুলিয়েনকে বুঝতে দিতে চায়নি।

তাই জুলিয়েনকে নিজের বাসায় থাকার প্রস্তাব দেয়াটা তার কাছে ভণ্ডামি মনে হয়েছিলো। মনে হয়েছিলো যেন সে বুঝি জুলিয়েনকে কিনে নিতে চাইছে। আবার হোটেলে থাকার জন্য টাকা দেয়ার প্রস্তাব আর বারবার সেটার প্রত্যাখ্যানও তার কাছে অসহ্য মনে হচ্ছিলো। শেষ পর্যন্ত সে তাদেরকে ঐ মরার ট্রাকেই ঘুমাতে বললো।

“আমি কোনো ট্রাকে ঘুমাতে পারবো না,” ছেলেটি বললো।

“বাইরের চেয়ে ট্রাকের ভেতরেই ঘুম ভালো হবে,” জুলিয়েন বললো, “এখন চলো।”

“এই অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার কথা মাথাতেও এনো না”, মোর্স বললো।

জুলিয়েন ছেলেটার কাঁধে হাত রাখলো এবং পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেলো।

“তুমি কিন্তু অনেক ক্লান্ত”, মোর্স জুলিয়েনের উদ্দেশ্যে চিৎকার করছিলো। কিন্তু সে জবাব দিয়েছিলো কিনা তা সে বুঝতে পারেনি, আশেপাশের ধাতব পৃষ্ঠের ওপরে বৃষ্টির হাতুড়ি পড়ার শব্দের জন্য।

তারা পিচঢালা পথ হেঁটে পার হলো। বাতাস এতো তীব্র ছিলো যে মোর্সকে আরেকটু পিছিয়ে যেতে হলো। জুলিয়েন বাতাসের পুরো ঝাপটা সহ্য করলো একেবারে সোজা হয়ে। একবারের জন্যেও সে মাথাটাও বাঁকায়নি। ছেলেটিও বাঁকায়নি। চার্লি, সে হয়তো জুলিয়েনের কাছ থেকে শিখছে – প্রস্তুতি থাক বা নাই থাক, ছেলেটা বৃষ্টির মধ্যে এমনভাবে হাঁটা শিখছে যেন বৃষ্টির নামগন্ধও নেই।

প্রত্যুত্তর দিন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *