দ্বিতীয়-তৃতীয়-চতুর্থ মাত্রা নিয়ে সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা

কসমস সিরিজের দশম পর্ব (The Edge of Forever বা নিরন্তরের প্রান্ত)-তে এত সহজে বস্তুর মাত্রা নিয়ে কথা বলেছিলেন কার্ল সেগান, দেখলে মুগ্ধ হতে হয়। সেই জায়গাটাকে আমাদের সাবটাইটেল সহ পরিবেশন করলাম। সবগুলো এপিসোডের বাংলা সাবটাইটেলের জন্য দেখুন – কসমস ১৯৮০ ডাউনলোড লিংক

বৃহত্তর মাপকাঠিতে কসমসকে মাপতে গিয়ে জ্যোতির্বিদরা মাঝে মাঝে বলেন যে, স্থান নাকি বাঁকানো। কিংবা মহাবিশ্ব সসীম কিন্তু অনন্ত। তারা আসলে কী বলতে চাচ্ছে?

ধরে নিন, আমরা একেবারেই সমতল। মানে, পুরোপুরি চ্যাপ্টা। এবং আমরা থাকিও চ্যাপ্টাভূমিতে (Flatland)। এটার নকশা আর নামকরণ করেছিলেন এডুইন অ্যাবট। উনি শেকসপীয়ার বিশেষজ্ঞ, থাকতেন ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডে। চ্যাপ্টাভূমির সবাই, অবশ্যই একেবারেই চ্যাপ্টা। আমাদের বর্গ আছে, বৃত্ত বা ত্রিভুজ আছে। আমরা ঘোরাঘুরি করি, বাসায় যাই, সকল চ্যাপ্টা কাজকর্ম করি। এখানে প্রস্থ আছে, দৈর্ঘ্য আছে, কিন্তু কোনো উচ্চতা নেই। এই টুকরোগুলোর কিছু উচ্চতা আছে। কিন্তু আসুন, সেটা বাদ দেই। ধরে নিই, এগুলো সম্পূর্ণ চ্যাপ্টা। তো, এমন পরিস্থিতিতে আমরা, অর্থাৎ চ্যাপ্টাবাসীরা, ডান-বাম চিনি, আগে-পিছের কথা জানি, কিন্তু কখনো ওপর-নিচের কথা শুনিনি।

Untitled

এবার ধরুন, সেই চ্যাপ্টাভূমির ওপরে, তিন মাত্রাবিশিষ্ট কিছু একটা হাজির হলো। ঘটনাচক্রে, এটা দেখতে অনেকটা আপেলের মত। ত্রিমাত্রিক এই জিনিসটি বেশ আকর্ষণীয় ও বন্ধুসুলভ বর্গ দেখলো। দেখল যে, সে তার ঘরে ঢুকছে। সে ঠিক করলো, দুটো ভিন্ন মাত্রার মধ্যে বন্ধুত্ব করার উদ্দেশ্যে “হ্যালো” বলবে।

“হ্যালো”, বললো আমাদের ত্রিমাত্রিক প্রাণীটি। “কী অবস্থা? আমি তৃতীয় মাত্রার একজন পর্যটক।” হুম, বেচারা বর্গ বদ্ধ ঘরের সবদিকে তাকালো। কাউকেই দেখলো না। উল্টো কে যেন সম্ভাষণ জানাচ্ছে তার শরীরের ভেতর থেকেই। যেন, অন্তরের কণ্ঠ! সে নিজের মানসিক সুস্থতা নিয়ে সন্দেহ শুরু করলো! ত্রিমাত্রিক প্রাণীটি বেশ নাখোশ হলো! তাকে মানসিক ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে!! তাই সে নেমে এলো, চ্যাপ্টাভূমিতে অবতরণের জন্য। এখন, ত্রিমাত্রিক প্রাণীটি চ্যাপ্টাভূমিতে আংশিকভাবে অস্তিত্বশীল। একটি তল বা একটি প্রস্থচ্ছেদ দেখা যাবে শুধু। যখন ত্রিমাত্রিক প্রাণীটি চ্যাপ্টা তলে প্রথম শরীর ছোঁয়ালো…শুধু স্পর্শ করা জায়গাগুলো দেখা যাবে। সেটা দেখাতে পারি, আপেলকে কালিতে চাপ দিয়ে আর সেটার ছাপ চ্যাপ্টাভূমিতে এঁকে দিয়ে। আপেলটা যতই নামবে, যতই চ্যাপ্টাভূমিকে ছেদ করতে থাকবে। আমরা ক্রমান্বয়ে আরো অনেক ফালি দেখতে পাবো। এটা দেখাতে পারি, আপেলটাকে কেটে। সেই বর্গ সাহেব দেখবে, একেক মুহূর্তে একেক বস্তু আবির্ভূত হচ্ছে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই। তাও আবার বদ্ধ ঘরে! আর এদের আকৃতিও নাটকীয়ভাবে পাল্টাচ্ছে। সে সিদ্ধান্ত নিলো, তার মাথাটা গেছে। তো, আপেলটা এই সিদ্ধান্তে সামান্য বিরক্ত হলো। এবারের কাজটা দুটো ভিন্ন মাত্রার মধ্যে তেমন বন্ধুত্বপূর্ণ হলো না। সে বর্গকে নিচে থেকে ধরলো। আর আমাদের চ্যাপ্টা প্রাণীটাকে দুলিয়ে দিলো, উড়িয়ে নিলো চ্যাপ্টাভূমির ওপরে। শুরুতে বর্গ কিছুই বুঝতে পারলো না। সে এখন ভীষণ বিভ্রান্ত। এমন কিছুই তার অভিজ্ঞতায় নেই। কিন্তু একটু পরে, সে বুঝতে পারলো যে সে চ্যাপ্টাভূমির বদ্ধ ঘরগুলোর ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে। সে তার চ্যাপ্টা বন্ধুদের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে। সে চ্যাপ্টাভূমিকে এমন এক দৃষ্টি দিয়ে দেখছে, যেভাবে ওর জানামতে, আর কেউ দেখেনি। অন্য মাত্রায় গিয়ে সে একটা আকস্মিক সুবিধা পেলো। যেন এক্স-রে দৃষ্টি পেলো। এবার সেই চ্যাপ্টাবাসী ধীরে ধীরে ভূমিতে নেমে এলো। বন্ধুরা ওকে দেখার জন্য ছুটে এলো। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে, সে হঠাৎ করে আবির্ভূত হয়েছে। কোথাও থেকে হেঁটে আসেনি, অন্য কোনো স্থান থেকে এসেছে। তারা বললো, “কী আলামত! কী হয়েছিলো তোর?” আর বেচারা বর্গকে বলতে হলো – “হুম, আমি একটা আধ্যাত্মিক মাত্রায় ছিলাম…যাকে বলে ‘ওপর’।”

অন্যরা তাকে হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দেবে অথবা জিজ্ঞেস করবে – “বেশ, দেখা আমাদেরকে, কই সেই তৃতীয় মাত্রা? কোনদিকে?” আর বেচারা বর্গ উত্তর দিতে ব্যর্থ হবে। কিন্তু হয়তো, আরো মজা হবে, যদি আমরা মাত্রার অন্য দিকটা দেখি। চতুর্থ মাত্রায় গেলে কী হবে? আসুন, সেটার জন্য একটা ঘনকের কাছে যাই।

ঘনকের ব্যাপারটা হচ্ছে এমন – একটা লাইনকে সমকোণের (৯০ ডিগ্রীর) দিকে টেনে আনুন। তাহলে বর্গ তৈরি হবে। বর্গটাকে তার সমকোণের দিকে তুললে, পেয়ে যাবেন ঘনক। তো এখন, আমরা জানি যে, ঘনকের ছায়া আছে। আর ঐ ছায়াতে আমরা দেখি, মানে, ক্লাস থ্রিতে দেখেছি অনেকবার – দুটো বর্গের শীর্ষগুলো সংযুক্ত হয়ে আছে। ত্রিমাত্রিক বস্তুর ছায়াকে দুই মাত্রাতে দেখলে, সব লাইনকে কিন্তু আর সমান মনে হয় না। সবগুলো কোণকে সমকোণ মনে হয় না। ত্রিমাত্রিক বস্তুটিকে দ্বিমাত্রিকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা যায়নি। এটা হচ্ছে ছায়ার মধ্যে একটা মাত্রা কম থাকার জরিমানা।

এবার, এই ত্রিমাত্রিক ঘনকের কথা ধরুন। চলুন, এটাকে নিয়ে যাই বস্তুর চতুর্থ মাত্রায়। এদিকে না, ঐদিকে না, ওদিকেও না। কিন্তু তিনদিকেই সমকোণ করে। আমি ঐ মাত্রাটা দেখাতে পারবো না। কিন্তু ধরে নিন, একটা চতুর্থ মাত্রা আছে। তাহলে আমরা একটা চতুর্মাত্রিক অধি-ঘনক পাবো। যেটাকে বলে টেসার‍্যাক্ট। আমি টেসার‍্যাক্ট জিনিসটা দেখাতে পারবো না, কারণ আপনি-আমি…তিন মাত্রাতে বন্দী হয়ে আছি। কিন্তু যেটাতে দেখাতে পারবো, তা হলো, চতুর্মাত্রিক অধিঘনকের ত্রিমাত্রিক ছায়া।

এই যে, দেখা যাচ্ছে যে, পাশাপাশি দুটো ঘনক যাদের সবগুলো শীর্ষ সংযুক্ত করা আছে। তো, চার মাত্রার আসল টেসার‍্যাক্টে কিন্তু সব লাইন হবে সমান, সব কোণ হবে সমকোণ। এখানে কিন্তু তেমন নয়। কিন্তু এটাই ছায়াতে দেখার জরিমানা। দেখলেন তো, আমরা চার মাত্রার জগত কল্পনা করতে না পারলেও, চিন্তা করতে পারছি ঠিকমতই।

এবার একটা ব্রহ্মাণ্ডের কথা ভাবুন, ঠিক সেই চ্যাপ্টাভূমির মত করে, যা পুরোপুরি দ্বি-মাত্রিক, সবদিকে সম্পূর্ণ চ্যাপ্টা। কিন্তু একটা ব্যতিক্রম আছে – বাসিন্দারা জানে না যে, তাদের দ্বিমাত্রিক ব্রহ্মাণ্ডটা বাঁকানো। এর তৃতীয় একটা মাত্রা (উচ্চতা) আছে। হয়তো গোলকের মত! কিন্তু যাই হোক…এটা তাদের অভিজ্ঞতার পুরোপুরি বাইরে। স্থানীয়ভাবে, তাদের ব্রহ্মাণ্ড দেখতে চ্যাপ্টাই দেখায়। কিন্তু যদি ওদের কেউ, আমার চেয়ে অনেক ছোটো আর চ্যাপ্টা কেউ, আপাতদৃষ্টিতে সরলরেখায় লম্বা এক পদযাত্রায় বের হয় তাহলে, সে একটা বিশাল রহস্য উন্মোচন করবে। ধরুন, সে এখান থেকে যাত্রা শুরু করলো আর তার মহাবিশ্ব অন্বেষণ করতে বেরুলো। কোনো বাঁক নিলো না, কোনো শেষ সীমানায় পৌঁছালো না। সে জানে না যে, তার মনে হওয়া চ্যাপ্টা ব্রহ্মাণ্ড আসলে বাঁকানো একটা গোলক। সে বুঝছে না যে, সে গোলকের ওপর হাঁটছে।

এ স্থানটা গোল হলো কেন?

কারণ ব্রহ্মাণ্ডে বস্তুর পরিমাণ এতো বেশি যে, তা মহাকর্ষ দিয়ে স্থানকে মুচড়ে দেয়। বস্তুকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে গিয়ে গোলক হতে বাধ্য করে। তবে আমাদের চ্যাপ্টা বাসিন্দারা তা জানে না। অনেক পরে সে আবিষ্কার করবে যে – সে ঘুরেফিরে শুরুর জায়গাতেই এসে পড়েছে। নিশ্চয়ই তৃতীয় কোনো মাত্রা আছে। আমাদের চ্যাপ্টাবাসী তৃতীয় মাত্রা কল্পনা করতে না পারলেও, বিষয়টি প্রমাণ করতে পারে। পুরো গল্পটাকে এক মাত্রা বাড়িয়ে দিলে যে পরিস্থিতি দাঁড়াবে, অনেক কসমোলজিস্টদের মতে, সেটা আমাদের জন্য প্রযোজ্য। আমরা ত্রিমাত্রিক প্রাণী, বাঁধা পড়ে আছি তিনটি মাত্রায়। আমরা আমাদের মহাবিশ্বকে তিনটি মাত্রায় সমতল ধরে নেই। কিন্তু হয়তো, এটা চতুর্থ কোনো মাত্রায় বেঁকে আছে। আমরা চতুর্থ মাত্রার কথা জানি, কিন্তু অভিজ্ঞতা নিতে পারি না। কেউ দেখাতে পারবে না, চতুর্থ মাত্রাটা কোনদিকে। ডান-বাম আছে, সামনে-পিছে আছে। ওপরে-নিচেও আছে। একই সাথে আরো কিছু দিক আছে, যেগুলো এই মাত্রাগুলোর সাথে সমকোণ করে আছে।

এখন ধরুন, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। আমরা যদি এটিকে চতুর্মাত্রিক বেলুনের মত ফোলাই, কী ঘটবে? নির্দিষ্ট ছায়াপথের কোনো জ্যোতির্বিদ মনে করেন যে, অন্য সব ছায়াপথ তার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যে ছায়াপথ যত দূরে, সেটার গতি তত বেশি মনে হয়। এটাই দেখেছিলেন হামাসন আর হাবল। এই বাঁকানো মহাবিশ্বের পৃষ্ঠে কোনো সীমারেখা বা কেন্দ্র নেই। এই ব্রহ্মাণ্ড একইসাথে সসীম এবং সীমানাহীন হতে পারে। দূরের ছায়াপথগুলির লালমুখিতা দেখে হামাসনের যুগে অনেকের মনে হয়েছিলো যে আমরা এই প্রসারণশীল ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে আছি, আর আমাদের অবস্থান আশীর্বাদপুষ্ট।

কিন্তু ব্রহ্মাণ্ড যদি বাড়েই, তাহলে চতুর্থ মাত্রায় বাঁকুক আর নাই বাঁকুক, প্রতিটি ছায়াপথের দর্শক ঠিক একই জিনিস দেখবে – সব ছায়াপথই তাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যেন ছায়াপথগুলোর মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। যদি বস্তুর পরিমাণ এতো বেশি হয় যে ব্রহ্মাণ্ড মহাকর্ষের চাপে চুপসে যাবে, তাহলে নিশ্চয়ই এটা গোলকের মতই মুড়ে আছে। যদি কসমসকে গুটিয়ে আনার জন্য পর্যাপ্ত বস্তু না থাকে, তাহলে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের আকৃতি উন্মুক্ত, যা চিরকাল ধরে সব দিকে বেড়ে চলেছে।

এই স্যাডল (ঘোড়ায় বসার আসন) টা মাত্র একটা আকৃতি। এমন উন্মুক্ত আকৃতির সংখ্যা অগণিত হতে পারে। এরা গোলকাকৃতির মত বদ্ধ ব্রহ্মাণ্ড নয়। এই উন্মুক্ত ব্রহ্মাণ্ডগুলোতে অসীম পরিমাণ জায়গা থাকে। যদি আমাদের মহাবিশ্ব সত্যিই বদ্ধ হয়, তাহলে কিছুই বেরুতে পারবে না। বস্তুও না, আলোও না। অর্থাৎ, আমরা হয়তো একটা কৃষ্ণগহবরের ভেতরে বাস করছি। অবশ্য, বেরুনোর একটা রাস্তা থাকবে। একটা প্রস্তাবিত সুড়ঙ্গ বা ওয়ার্মহোল, যা বস্তুর উচ্চতর মাত্রা ব্যবহার করে…যা বস্তু ও আলো, দুটোই শুষে নেয়। আমরা কি পাবো এমন কোনো ওয়ার্মহোল? পারবো, এই যাত্রার ধকল নিতে? হয়তো আমরা আবির্ভূত হবো অন্য কোনো স্থান বা কালে, অন্য কোনো ব্রহ্মাণ্ডে। অথবা হয়তো আমাদেরই ব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোথাও।

যদি জানতে চান, কৃষ্ণগহবরের ভেতরটা কেমন, তাকান চারপাশে। কিন্তু আমরা এখনো জানি না, ব্রহ্মাণ্ডটি উন্মুক্ত নাকি বদ্ধ। তার ওপর, কিছু জ্যোতির্বিদ সন্দিহান যে, দূরের ছায়াপথগুলোর লালমুখিতা আসলেই ডপলার ইফেক্টের জন্যে কিনা। তারা সন্দিহান, ব্রহ্মাণ্ডের প্রসারণ এবং কৃষ্ণগহবর নিয়ে। হয়তো, পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের অজ্ঞতাগুলোকে ততটুকু সহানুভূতি নিয়ে দেখবে, যেভাবে আমরা তাদেরকে দেখি, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, এটা না জানার জন্য।

একটি মন্তব্য “দ্বিতীয়-তৃতীয়-চতুর্থ মাত্রা নিয়ে সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা

প্রত্যুত্তর দিন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *