ফার্মি প্যারাডক্স: এলিয়েনরা সব কোথায়?

ফার্মি প্যারাডক্স : ১
এলিয়েনরা সব কোথায়?

মহাবিশ্বটা অবিশ্বাস্যরকম বিশাল – আছে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন নক্ষত্র আর ততোধিক গ্রহের মেলা। তো… বহির্জগতে প্রাণ থাকতেই পারে, তাই না? তবে কোথায় তারা? কেন আমরা কোনো এলিয়েনের দেখা পাচ্ছি না? ওরা কোথায়? আর সবথেকে বড় কথা হল, আর কেনই বা এসবের প্রত্যুত্তরে এই সুবৃহৎ জগতে আমাদের ভয়ঙ্কর দুর্ভাগ্যের কথা আমাদেরকে শুনতে হবে?

এ পুরো মহাবিশ্বে কেবল একমাত্র আমরাই কি বেঁচে আছি?

আমরা আমাদের মাতৃ-ছায়াপথের কোথায় আছি। এর কতোটুকুই বা আমাদের দৃষ্টিগোচর!!
আমরা আমাদের মাতৃ-ছায়াপথের কোথায় আছি। এর কতোটুকুই বা আমাদের দৃষ্টিগোচর!!

দৃষ্টিগোচর মহাবিশ্বের ব্যাস ৯০০ কোটি আলোকবর্ষের মত। এতে আছে অন্তত ১,০০০ কোটি ছায়াপথ, যার প্রতিটি ১ থেকে ১০ হাজার কোটি নক্ষত্রে ভরা। সম্প্রতি আমরা জেনেছি যে, তেমনই অসংখ্য গ্রহের হদিস পাওয়াটাও শক্ত কিছু নয়, এবং বহু বহু ট্রিলিয়ন বাসযোগ্য গ্রহের সম্ভাবনায় পরিপূর্ন এ মহাবিশ্বের মানে হল, এসবের মাঝে প্রাণ থাকার ও উন্নত হবার এক প্রবল সম্ভাবনা তো থেকেই যায়, তাই না? কিন্তু কোথায় ওরা? মহাবিশ্বটা অনেক মহাকাশযানে ভরে যাওয়া কি উচিৎ ছিলো না? তো চলো একটু পেছনের পাতা ওল্টানো যাক।

এমনকি যদি অন্য ছায়াপথগুলোয় এলিয়েন সভ্যতা থেকেও থাকে, সেকথা জানার আমাদের আর কোনোই উপায় নেই। মূলত, এই যে আমাদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত ছায়াপথ অন্তর্বর্তি অঞ্চল বা Local Group— এর বাইরের সবকিছুই চিরকালের জন্য আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে, কেননা জগৎ প্রসারিত হচ্ছে। এমনকি যদি আমাদের নিকট বেশ দ্রুত মহাকাশযান থেকেও থাকে, সোজা কথায় তাহলেও বহু শত-কোটি বছর লেগে যাবে ঐ সব স্থানের নাগাল পেতে, যুগযুগান্তর কেটে যাবে শুধুমাত্র মহাবিশ্বের ঐ শূন্যস্থানটুকু পেরোতে। তাই, আকাশ-গঙ্গাকেই ঘেঁটে দেখি বরং।

এ এমন বলয়, যে পরিসীমাতে প্রাণ থাকার মত উপযোগী পরিবেশ বিদ্যমান।
এ এমন বলয়, যে পরিসীমাতে প্রাণ থাকার মত উপযোগী পরিবেশ বিদ্যমান।

আকাশ-গঙ্গা, এ হল আমাদের ছায়াপথ। এতে আছে ৪০ হাজার কোটি নক্ষত্র। অগণিত নক্ষত্র— বা বলা যায় পৃথিবীর প্রতিটা বালুকণার জন্য ১০,০০০ টা করে নক্ষত্র। প্রায় ২ হাজার কোটির মত সূর্য-সদৃশ নক্ষত্রকে এ আকাশ-গঙ্গাতেই খুঁজে পাওয়া যাবে আর এক হিসেবে দেখা যায়, এর ৫ ভাগের বাসযোগ্য বলয়ে পৃথিবীর আকারের গ্রহ আছে। এ এমন বলয়, যে পরিসীমাতে প্রাণ থাকার মত উপযোগী পরিবেশ বিদ্যমান। যদি এর মাত্র ০.১% এর মধ্যেও প্রাণ থেকে থাকে, তবে আকাশ-গঙ্গায় ১০,০০,০০০ গ্রহ পাওয়া যাবে যেসবে প্রাণ আছে।

কিন্তু দাঁড়াও, আরও কথা আছে! আকাশ-গঙ্গা প্রায় ১৩’শ কোটি বছরের পুরনো। শুরুতে প্রাণ ধারণের জন্য এ তো ভালো জায়গা ছিলো না, কারন দিগ্বিদিকে সব যেন বিস্ফোরিত হচ্ছিলো। কিন্তু তার এক থেকে দু’শ কোটি বছর পর, প্রথম বাস-উপযোগী গ্রহসকলের আবির্ভাব হতে থাকে। পৃথিবী তো নিছক ৪’শ কোটি বছরের পুরনো। আর তাই অন্য গ্রহগুলোয় অতীতে আরও আগে থেকেই প্রাণ বিকশিত ও উন্নত হবার ট্রিলিয়ন সম্ভাবনা তো থেকেই যায়। এদের মাত্র একটিও যদি মহাকাশ-ভ্রমণ করার মত অতি উন্নত সভ্যতায় পরিণত হোতো, তাহলে তো এতদিনে আমরা তার হদিস পেতাম।

অমন এক সভ্যতা আসলে কেমন সভ্যতা? আছে তিনটে শ্রেণী।

শ্রেণী ১ সভ্যতা এর পুরো গ্রহের সকল শক্তিকে কাজে লাগাতে পারবে। তোমাদের কৌতূহল নিবারণের জন্য বলি, বর্তমানে আমরা সে তুলনায় স্কেলএর ০.৭৩ পর্যায়ে আছি। এবং আগামী কয়েক শ বছরে আমাদের শ্রেণী ১ এ উন্নীত হওয়া উচিৎ।

শ্রেণী ২ সভ্যতা তাদের নক্ষত্রের সকল শক্তিকে কাজে লাগাতে সক্ষম। এবার কিছু অভাবনীয় কল্পবিজ্ঞানের সাহায্য লাগবে, তবে নিয়মানুযায়ী এসব করা সম্ভব। এ হল ডাইসন পরিমন্ডলএর মত ধারণা, এক অতিকায় দুরূহ-জটিল জিনিস যা সূর্যকে ঘিরে থাকবে, এমনটাই ধারণা করা যায়।

শ্রেণী ৩ এমন এক সভ্যতা যারা আক্ষরিক অর্থেই নিয়ন্ত্রণ করবে নিজেদের পুরো ছায়াপথ ও তার শক্তিকে। এমন উন্নত এক এলিয়েন সম্প্রদায় আমাদের নিকট ঈশ্বর সমতূল্যই বটে।

কিন্তু প্রথমেই কেন অমন এলিয়েন সভ্যতার সাথে সাক্ষাতের কথাটা আসবে? যদি প্রজন্মান্তরে আমরা এমন এক নভোযান বানাতাম যা ১০০০ বছর ধরে আমাদের জীবিত বয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম, তাহলে আমরা ২০ লক্ষ বছরেই পুরো ছায়াপথে উপনিবেশ স্থাপন করতে পারতাম। মনে হচ্ছে সময়টা বেশ দীর্ঘ, তবে মাথায় রেখো, এ আকাশ-গঙ্গাও কিন্তু বিশাল। সুতরাং পুরো ছায়াপথে নিবাস নিতে যদি ২০ লক্ষ বছর বা তার অধিক সময় লেগেও যায়, এবং শত কোটি না হোক অন্তত ১০ লক্ষ এমন গ্রহ আকাশ-গঙ্গাতেই রয়েছে যেখানে প্রাণ আছে, এবং এই অন্যসব জীবন নিশ্চই আমরা যে সময় পেয়েছি তার চাইতেও বিপুল সময় পেয়ে থাকবে, তাহলে…

ঐসব এলিয়েন- ওরা কোথায়?

এই হল ফার্মি প্যারাডক্স, আর কারও কাছে এর কোন উত্তর নেই। তবে আমাদের কিছু ধারণা আছে।

এবার চলো ফিল্টার নিয়ে কিছু বলা যাক। এ প্রসঙ্গে, ফিল্টার এক প্রতিবন্ধকের ইঙ্গিত দেয় যা জীবনের পক্ষে পেরিয়ে আসা দুষ্কর। তাদেরকে নানান সব সর্বনাশা ধাপের পরিস্থিতি উতরে আসতে হয়।

একঃ কিছু গ্রেট্‌ ফিল্টার আছে যা আমরা পেরিয়ে এসেছি। জটিল জীবন উন্নতির ক্ষেত্রে এ এক কঠিনতর পরীক্ষা। প্রাণ উদ্ভবের পেছনে থাকা প্রক্রিয়াকে এখনো তো ঠিকভাবে বোঝাই যাচ্ছে না, আর এর দরকারি শর্তাবলী আরও জটিল হতেই পারে। অতীতে হয়তো মহাবিশ্ব আরও প্রতিকূল ছিলো। আর সম্প্রতিই সব ঠান্ডা হয়ে জটিল প্রাণ বিকশিত হবার এ এক অনুকূল পরিবেশ হয়ে উঠেছে। এতে আরও বোঝায় যে, হয়তো আমরাই এক ও অনন্য, কিংবা অন্তত, একেবারে প্রথম না হলেও এ পুরো মহাবিশ্বের মধ্যে প্রথম দিককার সভ্যতা হলাম আমরা।

দুইঃ আমাদের সামনেই আছে আরও কিছু গ্রেট ফিল্টার। এ তো ভালো খবর নয়। আমাদের মতো জীবনের লীলা খেলা হয়তো জগতের সবখানেই আছে, আর উন্নতির এক নির্দিষ্ট বিন্দুতে পৌঁছেই তারা সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ এমন এক বিন্দু যার রেখা আমাদের সম্মুখেও আঁকা আছে।

যেমন ধরা যাক, উন্নত হতে হতে ভবিষ্যতের অভাবনীয় এক প্রযুক্তি সক্রিয় হয়ে অমনি গ্রহটা গেল ধ্বংস হয়ে। হয়তো প্রতিটি উন্নত সভ্যতার শেষ কথা হতে পারে,”এই নতুন যন্ত্রটা হল আমাদের সকল সমস্যার সমাধান, চালু করতে এবার আমি এর বোতামে চাপ দিলাম!”

এসব যদি সত্য হয়, তবে মানব ইতিহাসের শুরুর সময়ের চাইতেও আমরা এর সমাপ্তির আরও কাছে চলে এসেছি। অথবা, প্রাচীন সেই তৃতীয় শ্রেণীর সভ্যতা হয়তো জগতকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে আর, যখনই অন্য এক সভ্যতা যথেষ্ট উন্নত হয়ে ওঠে, ওরা এদেরকে জগৎ থেকে মুছে দেয়। একেবারে সাথে সাথেই। কিছু না কিছু তো রয়েছেই, যা অনাবিষ্কৃত থাকাই বোধয় ভালো। আমাদের পক্ষে যা জানার কোনোই উপায় নেই।

পরিশেষে একটা কথাঃ আমরা বোধয় একাই রয়েছি।

এই মুহুর্তে, আমাদের কোনো প্রমাণ নেই যে আমাদের ছাড়া আর অন্য কোথাও প্রাণ-চাঞ্চল্য আছে। কিছুই নেই। জগৎ কেবলই ফাঁকা আর নিষ্প্রাণ হয়ে প্রকাশিত হয়ে চলেছে। কেউই আমাদেরকে বার্তা পাঠাচ্ছে না, কেউই আমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। হতে পারে আমারা একেবারেই একা, আর অনন্ত মহাবিশ্বের এক ক্ষুদ্র আর্দ্র কাদার গোলোকেই বন্দী হয়ে আছি।

এমনটা ভেবে তুমি ভয় পেয়ে গেলে নাকি? যদি পেয়ে থাকো, তবে তোমার মনের অমনতর অনুভূতি স্বাভাবিক। যদি আমাদের সামনে এ গ্রহের প্রাণ-বৈচিত্র শেষ হয়ে যায়, বোধয় জগতে আর কোনো প্রাণ অবশিষ্ট রইবে না, জীবন ফুরিয়ে যাবে, হয়তো চিরকালের জন্য। এই যদি হয় পরিস্থিতি তবে, আমাদেরকে নক্ষত্র থেকে নক্ষত্র পরিভ্রমণ করে যেতে হবে আর তৃতীয় শ্রেণীর প্রথম এক সভ্যতায় উন্নিত হতে হবে, যেন আমরা প্রাণের অস্তিত্বের শিখাটি রেখে যেতে পারি এবং মহাজগতের অন্তিম নিঃশ্বাসের আগ্‌ পর্যন্ত তা যেন ছড়িয়ে যেতে পারি সবকিছু বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবার আগেই।

এ মহাবিশ্ব কোনো একজনের পক্ষে চষে বেড়াবার জন্য খুব যে বেশি সুন্দর, তা কিন্তু নয়।

 

ফার্মি প্যারাডক্স : ২
– কূলকিনারা আর সমাধানের পথ –
এলিয়েনরা সব কোথায়?

এলিয়েনরা সব কোথায়? মহাবিশ্ব অনেক বিশাল আর অনেক পুরনো, তবে এখনও কেন কোনো এলিয়েনের দেখা মেলে নি? তাদের বাস কি তবে কম্পিউটারের মধ্যে? তবে কি তারা অতীতের কোনো মহাশক্তিধর বুদ্ধিমান সভ্যতার কারনে চিরতরে মুছে গেছে। নাকি ওদের উদ্দ্যেশ্যকে বুঝবার ক্ষেত্রে আমরা কেবল আদিম অবস্থাতেই রয়েছি? উত্তর যাই হোক না কেন, অবিশ্বাস্য হলেও এটা আমাদের ভবিষ্যতের এক গুরুত্ত্বপুর্ন ব্যাপার।

পৃথিবীর প্রতিটি বালুকণার জন্য ১০,০০০ টা করে নক্ষত্রের সম্ভাবনায় গড়া আমাদের কেবল এই দৃষ্টিগোচর মহাবিশ্বটুকু। আমরা জেনেছি ট্রিলিয়নেরও অধিক গ্রহ আছে। আর এলিয়েনরা সব কোথায়? এই হল ফার্মির প্যারাডক্স। আরও ধারণা পেতে এর প্রথম খন্ড দেখে নিতে পারো। এখানে আমরা ফার্মির প্যারাডক্সের সম্ভাব্য সমাধানের খোঁজ চালাব।

তো আমরা কি ধ্বংস হতে চলেছি, নাকি পরম সৌভাগ্য আমাদের জন্য অপেক্ষায় আছে?

মহাকাশ যাত্রা শক্ত কাজ। যদিও বা সম্ভবপর হয়, তারপরও অন্য নক্ষত্রে যাত্রা করা এক মস্ত চ্যালেঞ্জের ব্যাপার বৈকি। বিপুল পরিমাণ পণ্য-রসদ-সামগ্রীকে কক্ষপথের ঐ যানটিতে ঠেলে নিয়ে গিয়ে জড়ো করতে হবে। সহস্র কালের পরিভ্রমণে দরকার এমন বংশবিস্তার যেন তা পুনরায় শুরু করার জন্য যথেষ্ট হয়। আর নতুন গ্রহটাকে দূর থেকে যতোটা ভালো মনে হচ্ছিল অতোটা যুৎসই নাও হতে পারে। অতীতে যাত্রায় টিকে থেকে যারা নিজেদের যানটিকে গ্রহটাতে নামানোর চেষ্টা করেছিল তা হয়তো তাদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ-সাধ্য ব্যাপার ছিলো। আর বহির্জাগতিক গ্রহের আক্রমণ ঠেকানো হয়তো অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

সেই সাথে সময়ের নিরিখে মহাবিশ্ব অত্যন্ত পুরাতন। পৃথিবীতে অন্তত ৩শ ৬০কোটি বছর ধরে প্রাণ আছে। যেখানে বুদ্ধিমান মানুষের বাস প্রায় ২,৫০,০০০ বছর ধরে। তবে বলা যায় কেবল ১ শতকের মধ্যেই আমরা এমন প্রযুক্তির নাগাল পেয়েছি যা বিপুল দূরত্ব পেরিয়ে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম। অভিজাত এমন এলিয়েন-সাম্রাজ্য থাকতেই পারে যা হাজারো ধরণকে রপ্ত করে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে টিকে রয়েছে, আর আমরা তাদের কোনো চিহ্নই পাচ্ছি না।

দূরের জগতে হয়তো প্রকাণ্ড সব ধ্বংসের স্মৃতিচিহ্নের ঢেউ খেলে যাচ্ছে। পৃথিবীর জীব-বৈচিত্রের তো ৯৯% মরে শেষ হয়েছে। আর এটা সহজেই প্রতিপন্ন করা যায় যে, এমনটাই আমাদের ভাগ্যে আছে তা সে এখন-তখন যখুনিই হোক। বুদ্ধিমান প্রাণী হয়তো উন্নত হয়ে জগতের নানা মণ্ডলীতে ছড়িয়ে গিয়ে বারংবার মরেও যেতে পারে। তবে হয়তো ছায়াপথ চষে বেড়ানো সভ্যতাগুলোর এমনটা হয় নি। আর তাই এ হয়তো জগতে জীবনের ঐক্যবদ্ধ পারদর্শিতার ফল, যা থেকে নক্ষত্রের পানে চেয়ে বিস্ময়ের সেই প্রশ্নের কিনারা পাওয়া যে “আর সকলে কোথায়?”

তবে এলিয়েনরা যে আমাদের মতই হবে– তার কোনো কারণ নেই, কিংবা আমাদের যুক্তি-ধরণ যে তাদের ক্ষেত্রেও খাটবে তেমনটাও নয়। হতে পারে আমাদের যোগাযোগ-প্রযুক্তি কেবল আদিম আর সেকেলে। ভেবে দেখো, মোর্স-সংকেত-প্রেরকযন্ত্র দিয়ে একটা ঘরে বসে তুমি বার্তা প্রেরণ করে ডেকে যাচ্ছো অথচ কেউ সারা দিচ্ছে না আর ভাবছো যে তুমি একা, হয়তো আমরা বুদ্ধিমান প্রাণীদের পক্ষে এখনও সনাক্তকরণের অযোগ্য আর এমনটাই রয়ে যাবো যতোক্ষণ না পর্যন্ত আমরা সঠিকভাবে যোগাযোগের ধরণকে রপ্ত করতে পারবো। এবং এমনকি এলিয়েনদের সাথে যদি আমাদের সাক্ষাৎও হতো, তবে তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য এতোই বেশি হতো যে তাদের সাথে যুৎসই যোগাযোগ করতেই পারতাম না।

তোমার কল্পনায় সবথেকে বুদ্ধিমান কাঠবেড়ালটি কেমন ভেবে দেখো তো, যতো কঠিন চেষ্টেই করো না কেন কিছুই আসে যায় না, তুমি আমাদের সমাজ নিয়ে ওকে বোঝাতেই পারবে না। মোদ্দা কথা হচ্ছে, কাঠবেড়ালের দিক থেকে একটা গাছ হল ওর বেঁচে থাকবার জন্য পরিশীলিত যুৎসই কিছু একটা। তাই সে জানে যে বন-জঙ্গল কেটে ফেলা পাগলামি। তবে বন কেটে ফেলার মানে এই নয় যে, আমরা কাঠবেড়ালকে ঘৃণা করি। আমরা শুধু রসদ চাই। কাঠবেড়ালের আশা-আকাঙ্ক্ষা আর তার টিকে থাকার ব্যাপার আমাদের কাছে কোনো মাথাব্যাথা নয়।

তৃতীয় শ্রেণীর সভ্যতারও রসদ-সম্পদের দরকার হতে পারে আর তেমন ভাবে তারাও আমাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। হয়তো তাদের দরকার পড়ল আর প্রয়োজনকে সহজসাধ্য করতে আমাদের মহাসাগরকে অমনি বাষ্পীভূত করে ফেলল। কোনো এলিয়েন ক্ষণিকের জন্য ভাবলো “দেখো দেখো আহা বেচারা, এরা কত্তো ছোট, কত্তো সুন্দর সব কংক্রিটের কাঠামো বানিয়েছে, আচ্ছা বেশ, যাহ্, মরে গেল সব।” এসব ঘটনা হয়তো তারা সব শুষে নেবার আগেই হয়ে যাবে।

কিন্তু যদি এমন সভ্যতা থেকে থাকে যারা অন্য প্রাণীদের সত্য-সত্যই মুছে দিতে চায়। এখানে নিজেদের সম্পদ-প্রাচুর্য্য বৃদ্ধিটা উদ্দীপক নয় বরং ওদের সভ্যতার ধরণটাই হয়তো অমন। সে যাই হোক, তারা যথাযথ অস্ত্র-সজ্জিত হয়ে এ প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করতে আরও কার্যকারী হয়ে উঠতে পারে। তারা ক্ষুদ্রাকায় ন্যানো-মেশিন দিয়ে এক স্বয়ংক্রিয়-প্রতিরূপ নির্মাণকারী মহাকাশ-যান তৈরি করে ফেলবে। তারা একেবারে আণবিক পর্যায়ে যা অবিশ্বাস্যরকম দ্রুত আর সাংঘাতিক কিছুর লাগাম ধরবে, যার শক্তির বলে আক্রমণ করে সব কিছুকে সাথে-সাথেই ছিন্নভিন্ন করে ফেলা যাবে। এ এমনই যে এটা চালাতে হলে তোমায় কেবল চার ধরণের নির্দেশ দিতে হবে।

  • এক, প্রাণ আছে এমন গ্রহ খুঁজে বার করো।
  • দুই, ঐ গ্রহের সবকিছুকে ছিন্নভিন্ন করে তাদেরকে প্রাথমিক উপাদানের অংশে ভাগ করে ফেলো।
  • তিন, উপাদানগুলোকে নতুন মহাকাশ-যান বানাতে ব্যবহার করো।
  • চার, কাজগুলির পুনরাবৃত্তি করো।

এমন সর্বগ্রাসী-মারণ-যন্ত্র কয়েক লক্ষ বছরে পুরো একটা ছায়াপথ চষে বেড়িয়ে একে নির্জীব করে ফেলতে পারে। কিন্তু তা সে কাঁচামালের জন্যই হোক কিংবা গণহত্যার জন্য– তুমি কেন আলোকবর্ষের পর আলোকবর্ষ পাড়ি দেবার পথে নামবে।

আলোর এ গতি আসলে যথেষ্ট দ্রুত নয়। যদি কেউ আলোর গতিতে ছুটতে পারে, তবে তার আকাশ-গঙ্গা ছায়াপথকে একবার অতিক্রম করতে ১০,০০০ বছর সময় লাগবে। আর তোমার গতি হয়তো আরও ধীর। হয়তো এমন কোন উপায় আছে যা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সভ্যতার সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চাইতে বেশি গ্রহনযোগ্য হবে।

এক অত্যাশ্চর্য ধারণা হল ম্যাট্রিঔস্কা ব্রেইন। এ হল নক্ষত্রকে ঘিরে থাকা এক অতিকায় জিনিস, এক কম্পিউটার যার গণনার ক্ষমতা এমনই যে, একটা পুরো প্রজাতি গুষ্টিসুদ্ধ নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে ওতে আপলোড করে রাখতে পারবে আর টিকে রইবে এক কৃত্রিম মহাজগতে। ফলে, যে কেউ অন্তহীন পরমানন্দের ধারায় ডুবে থাকতে পারবে, কখনোই আর জন্মাতে বা দুঃখ পেতে হবে না, একেবারে যথাযথ জীবন।

যদি লাল বামনকে ঘিরে গড়ে তুললে এ কম্পিউটার ১০ ট্রিলিয়ন বছর অব্দি চলৎশক্তি পেতে থাকবে। যদি এমনটাই হয়, তবে কে আর চাইবে অন্য ছায়াপথ জয় করতে কিংবা অন্য জীব-জগতের সাথে কথা কইতে।

ফার্মির প্যারাডক্সের এই সকল সমাধানের মধ্যে একটা ঘাপলা আছে। আমরা জানি না, প্রযুক্তি শেষ সীমায় কোথায় গিয়ে ঠেকবে। আমরা হয়তো সীমানার কাছাকাছি যেতে পারবো কিংবা কাছাকাছিও পৌঁছুতে পারবো না। আর হয়তো এমন মহাশক্তিধর প্রযুক্তি আমাদের অপেক্ষায় রত, যা আমাদের অমর করবে, ছায়াপথের দূরদূরান্তে নিয়ে গিয়ে ঈশ্বর সমতূল্য পর্যায়ে উন্নীত করে তুলবে।

একটা কথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, আমরা কিছুই জানি না। মানবকুল শিকারী-সংগ্রাহকদের সময় থেকে এখন অব্দি তাদের অস্তিত্বের নব্বই শতাংশেরও বেশি সময় ব্যয় করেছে। ৫০০ বছর আগে আমরা ভাবতাম, কেবল আমরাই মহাবিশ্বের কেন্দ্র। ২০০ বছর আগে আমরা শক্তির প্রধান উৎস্য হিসেবে মনুষ্য-শ্রমনির্ভরতাকে কাটিয়ে উঠেছিলাম। ৩০ বছর আগে আমাদের হাতে এসেছে সর্বগ্রাসী অস্ত্র যা রাজনৈতিক মতানৈক্যতার দরুন একে অন্যের দিকে তাক করে রেখেছি।

বিশ্বজগতের সময়ের মাপকাঠিতে আমাদের এ তো কেবল জন্মগ্রহণ, আমরা অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি কিন্তু এখনও বহুদূর চলার বাকি। নিজেদেরকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র ভাববার মানসিকতা এখনও মানুষের মধ্যে দেখা যায়, তাই মহাবিশ্বের জীবন নিয়ে হিংসাত্মক ধারণাগুলো তৈরি হওয়াটা সহজ বটে।

কিন্তু পরিশেষে, সত্যকে খুঁজে পাবার তো একটাই পথ, তাই নয় কি?


পোস্ট নিয়ে কিছু কথাঃ

এ লেখাটি হল দুটি ধারাবাহিক ভিডিও’র কথার হুবহু বাংলা অনুবাদ।

ভিডিও দুটির হলঃ
The Fermi Paradox — Where Are All The Aliens? (1/2) : YouTube

The Fermi Paradox II — Solutions and Ideas – Where Are All The Aliens? : YouTube

এ দুটি ভিডিও’র সাবটাইটেল ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করার জন্য আমি amara.org এর অনলাইন tool ব্যাবহার করেছি
তথ্যসূত্রঃ
The Fermi Paradox — Where Are All The Aliens? (1/2) : Amara

The Fermi Paradox II — Solutions and Ideas – Where Are All The Aliens? : Amara

এই লেখা সম্পর্কিত কিছু সহায়ক লিংকঃ
The Fermi Paradox : Wait but why

Matrioshka Brain : Wikipedia
Grey Goo : Wikipedia


3 মন্তব্য “ফার্মি প্যারাডক্স: এলিয়েনরা সব কোথায়?

প্রত্যুত্তর দিন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *