ডিম (The Egg)

ডিম (The Egg)

 অ্যান্ডি উইয়ার

the-egg-by-andy-weir

[লেখক অ্যান্ডি উইয়ার আগে ছিলেন একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, তার প্রথম উপন্যাস  দ্যা মার্শিয়ান এর ব্যাপক সাফল্যের পর এখন পুরোদমের লেখক। জ্বি ঠিক ধরেছেন, ম্যাট ড্যামন অভিনীত, রিডলে স্কট পরিচালিত বিখ্যাত মুভি দ্যা মার্শিয়ান লেখকের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত।]


মারা যাওয়ার সময় তুমি বাড়ি যাচ্ছিলে।

ওটা একটা কার অ্যাক্সিডেন্ট ছিল। অ্যাক্সিডেন্টটা মারাত্মক ছিল সন্দেহ নেই, তবে এছাড়া বলার মতন আর তেমন কিছু নেই। মৃত্যুকালে তুমি তোমার স্ত্রী এবং দুই ছেলেকে রেখে গিয়েছ। মৃত্যুর সময় তোমার তেমন কষ্ট হয়নি। ইএমটি’র(Emergency Medical Technician) লোকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু লাভ হয়নি। দুর্ঘটনায় তোমার পুরো শরীরের হাড্ডি-গুড্ডি ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বাস করো, মরে গিয়েই বরং তোমার অনেক ভাল হয়েছে।

এবং তারপরেই আমার সাথে তোমার সাক্ষাৎ হয়।

“ কী…কী হয়েছিল?” তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে “কোথায় আমি?”

আমি উত্তর দিলাম, সত্যিটাই বললাম ‘তুমি মারা গিয়েছ’। এটা নিয়ে তর্ক করার মতন কিছু নেই।

“একটা ট্রাক আসছিল…ট্রাকটা পিছলে যাচ্ছিলো..”

“হুম” আমি বললাম।

“আমি… আমি মারা গেছি?”

“হুম, কিন্তু এটা নিয়ে মন খারাপ করার কিছু নাই, মানুষ মাত্রই মরণশীল” আমি বললাম।

তারপর, তুমি চারদিকে তাকিয়ে দেখলে। চারদিকটা আসলে শূন্যতায় ভরা, আছি শুধু তুমি আর আমি।“এই জায়গাটা কোথায়?” তুমি প্রশ্ন করলে “এটাই কি মৃত্যু পরবর্তী জীবন?”

“ম্মম…কমবেশি বলা যায়” আমি বললাম।

“তুমিই কি ঈশ্বর?” তুমি প্রশ্ন করেছিলে।

“হুম” আমি উত্তর দিলাম “আমিই ঈশ্বর”

“আমার বাচ্চারা…আমার স্ত্রী…”

“হুম, কী হয়েছে?” আমি বললাম।

“ওরা আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে তো?”

“এটাই আমি দেখতে চাচ্ছিলাম” আমি বললাম। “তুমি মাত্র মারা গেলে আর তোমার প্রথম চিন্তা পরিবার নিয়ে। ভাল একটা বিষয়”।

তুমি অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালে। তোমার কাছে আমাকে ঠিক ঈশ্বরের মতন মনে হচ্ছিল না। আমাকে দেখাচ্ছিল কোনো সাধারণ লোকের মতন, অথবা সম্ভবত কোনো নারীর মতন। সম্ভবত, মেকি কোনো কর্তৃত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের মতন। সর্বশক্তিমানের বদলে প্রাইমারি স্কুলের কোনো টিচারের মতন।

“চিন্তার কিছু নেই” আমি বললাম। “ওরা ভাল থাকবে। তোমার বাচ্চারা সবদিক দিয়ে তোমাকে ভালমতই মনে রাখবে, ভাল মানুষ হিসেবে। তোমাকে ঘৃণা করার মতন সময় ওরা পায়নি। তোমার স্ত্রী বাইরে তোমার জন্য কাঁদবে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে স্বস্তিবোধ করবে। সত্যি বলতে কি, তোমাদের দাম্পত্য জীবন প্রায় ভেঙ্গেই পড়েছিল। তারপরও স্বান্তনা দেওয়ার জন্য বলি, তোমার স্ত্রী স্বস্তিবোধ করার জন্য অপরাধবোধে ভুগবে।”

“ওহ” তুমি বললে। “তাহলে এখন কী ঘটবে? আমি কি স্বর্গে যাব না নরকে নাকি অন্য কোথাও?”

“কোনোটাই না” আমি বললাম “তোমার পুনর্জন্ম হবে”

“ওহ” তুমি বললে “তাহলে হিন্দুদের কথাই ঠিক ছিল”

“সব ধর্মই তাদের নিজেদের মতন করে ঠিক” আমি বললাম “চলো, একটু হাঁটি”

মহাশূ্ন্যের মধ্যে দিয়ে আমরা হাঁটছিলাম, “কোথায় যাচ্ছি আমরা?”

“বিশেষ কোথাও না” আমি বললাম “হাঁটার সময় কথা বলতে ভাল লাগে, এই আরকি”

“তাহলে এখানে পয়েন্টটা কোথায়?” তুমি জিজ্ঞাসা করলে “আমি যখন আবার জন্মাব, তখন কোনো স্মৃতি ছাড়াই জন্মাব, ঠিক? একটা বাচ্চার মত, তাহলে এই জন্মে আমার যত অভিজ্ঞতা, আমি যা করেছি তার কোন মূল্যই থাকবে না”

“ঠিক তা না” আমি বললাম “তোমার মধ্যে তোমার আগের সকল জন্মের জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চিত আছে। সেসব এখন মনে করতে পারছো না, এই যা।”

আমি হাঁটা থামিয়ে দিয়ে তোমার কাঁধ স্পর্শ করলাম। “তোমার আত্মা এতটাই অসাধারণ, দারুণ এবং বিশাল যে তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তুমি কী, সেটার কেবল একটা ক্ষুদ্র অংশ একটা মানব মন ধারণ করতে পারে। একটা গ্লাসের পানি ঠাণ্ডা না গরম তা বোঝার জন্য আঙ্গুল দিয়ে বোঝার মতন বিষয়টা। শরীরের কেবল একটা ক্ষুদ্র অংশ দিয়ে তুমি পুরো পাত্রের বিষয় সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করো।

“গত ৪৮ বছর ধরে তুমি একটা মানুষের মধ্যে ছিলে, তোমার যে সুবিশাল অভিজ্ঞতা আর স্মৃতি সেটা অনুভব বা বোঝা বা মনে করার মতন সময় এখানে তোমার এখনো হয়নি। যদি এখানে লম্বা একটা সময় কাটাও তবে সব মনে করতে পারবে। কিন্তু প্রত্যেকটা জীবনের মাঝখানে এ কাজ করার কোনো মানে হয় না।”

“তাহলে মোট কয়বার আমার পুনর্জন্ম হয়েছে?”

“অনেক অনেক অনেকবার এবং ভিন্ন ভিন্ন জীবনে” আমি উত্তর দিলাম “এবার তুমি ৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে চীনের এক কৃষক পরিবারে বাচ্চা মেয়ে হিসেবে জন্ম নেবে।”

“কি?” তুমি তোঁতলানো শুরু করলে “আমাকে অতীত পাঠাচ্ছো?”

“হ্যাঁ, টেকনিক্যালি বলা যায়। তোমার জগতে সময়ের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু আমি যেখান থেকে এসেছি সেখানে বিষয়টা ভিন্নরকমের।”

“তুমি কোত্থেকে এসেছ?” তুমি প্রশ্ন করলে।

“ওহ! আমি এসেছি কোথাও থেকে, অন্যকোথাও থেকে” আমি ব্যাখ্যা করলাম “এবং সেখানে আমার মতন আরো আছে। জানি, এখন জানতে চাইবে জায়গাটা কেমন, কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে বললেও বুঝতে পারবে না।”

“ওহ” তুমি কিছুটা হতাশ হয়েছিলে। “যদি কোনো সময়ে আমি অন্য কোথাও আবার জন্মাই, তবে আমার সাথে অন্য আমার কোনভাবে দেখাও হতে পারে।”

“অবশ্যই, সব সময় তাই ঘটে। তবে প্রত্যেকটা মানব জীবন কেবলমাত্র তার নিজের জীবনকাল সম্পর্কে জানায় আসলে কী ঘটছে তা জানতেই পারবে না।”

“তাহলে এসবের মানে কী?”

“সিরিয়াসলি?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম “সিরিয়াসলি? আমাকে জিজ্ঞেস করছ জীবনের মানে কি? একটু বেশি গঁৎবাঁধা প্রশ্ন হয়ে গেল না?”

“এটা একটা যৌক্তিক প্রশ্ন কিন্তু” তুমি অনড় রইলে।

আমি তোমার চোখে চোখ রেখে বললাম, “জীবনের মানে, আমার এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরির উদ্দেশ্য তোমাকে পরিপূর্ণ করে তোলা।”

“তার মানে মানবজাতিকে? তুমি চাও আমরা পরিপূর্ণ হয়ে উঠি।”

“না, শুধু তুমি। এই পুরো বিশ্ব তৈরি করেছি কেবল তোমার জন্য। প্রত্যেকটা নতুন জীবনের মধ্যে দিয়ে তুমি বেড়ে উঠবে, পরিপূর্ণ হবে। আরো বড় এবং মহৎ ধীশক্তিতে পূর্ণ হবে।

“শুধুই আমি? অন্য সবার ব্যাপারে কী হবে?”

“এখানে তো আর কেউ নেই” আমি বললাম “এই বিশ্বে কেবল তুমি আর আমি।”

শূন্য একটা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালে। “কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত লোক… ”

“সবই তুমি। তোমারই ভিন্ন ভিন্ন পুনর্জন্ম”

“কী, সবাই আমি?”

“এই তো বেশ বুঝতে পারছো।” অভিনন্দন জানানোর মত করে তোমার পিঠটা চাঁপড়ে দিয়ে আমি বললাম।

“এ পর্যন্ত যত মানুষ জন্মেছিল সবাই আমি?”

“অথবা যারা জন্মাবে, হ্যাঁ।”

“আমিই আব্রাহাম লিঙ্কন?”

“হ্যাঁ, এবং তুমিই জন উইলকস বুথও বটে।” আমি যোগ করলাম। (জন উইলকস বুথ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের হত্যাকারী।)

“আমিই হিটলার?” তুমি মর্মাহত হয়ে জিজ্ঞেস করলে।

“এবং তুমিই লক্ষ লক্ষ লোক যাদেরকে সে হত্যা করেছিল।”

“আমিই যিশু?”

“এবং তুমিই সবাই, যারা তাকে অনুসরণ করেছিল।”

তারপর তুমি নীরব হয়ে গেলে।

“প্রত্যেকবার তুমি কাউকে আঘাত করছিলে, কষ্ট দিচ্ছিলে আসলে তুমি নিজেকেই আঘাত করছিলে, কষ্ট দিচ্ছিলে। প্রত্যেকবারই তুমি কাউকে দয়াপরবশ হয়ে কিছু করছিলে তুমি আসলে তোমাকেই দয়া করছিলে। যে কোনো মানুষের প্রত্যেকটা খুশির এবং দুঃখের মূহুর্তের অভিজ্ঞতা আসলে তোমারই অভিজ্ঞতা, যা হয়েছে আর যা ভবিষ্যতে হবে সবই তোমার অভিজ্ঞতা।

তারপর তুমি চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলে লম্বা সময়ের জন্য।

“কেন?” তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করলে, “এত কিছু করার দরকারটা কী?”

“কারণ, কোনো একদিন তুমিও আমার মতন হবে। কারণ তুমি আসলে ঠিক তাই-ই। কারণ, তুমিও ঠিক আমারই মতই, আমরা আসলে একই জাতের। তুমিই আমার সন্তান।”

“কী!?” তুমি অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞাসা করলে, “তার মানে আমিও একজন ঈশ্বর?”

“না, এখনো না। এখন তুমি একটা ভ্রুণ মাত্র। এখনো তুমি শিখছো। একটা সময় আসবে যখন তুমি সব ধরনের মানব জীবন যাপন করবে তখনই কেবল তুমি জন্মানোর মত প্রস্তুত হবে।”

“তাহলে পুরো বিশ্বটা” তুমি বললে “কেবলই একটা…”

“একটা ডিম” আমি উত্তর দিলাম, “সে যাই হোক, এখন সময় তোমার পরবর্তী জীবনে জন্মানোর।”

তারপর তোমাকে আমি তোমার পথে পাঠিয়ে দিলাম।

মূল গল্প

প্রত্যুত্তর দিন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *