দ্যা লিটল ম্যাচ গার্ল – Hans Christian Anderson এর ছোটো গল্প

The Little Match Girl
Hans Christian Andersen

170167_1237813852107_436_290

বছরের শেষ সন্ধ্যাটা ছিলো তুষারাবৃত, ভীষণ ঠাণ্ডা আর বেশ খানিকটা অন্ধকার। একটি ছোট দরিদ্র মেয়ে সেই অন্ধকার আর ঠাণ্ডায় একাকী রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। তার মাথা ঢাকা ছিলো না, পাও খালি ছিলো। বাড়ি থেকে বের হবার সময় তার পায়ে চটি ছিলো। কিন্তু তাতে লাভের লাভ কিছু হয়নি। কারণ, চটি জোড়ার সাইজ ছিলো বেশ বেঢপ বড়; দীর্ঘকাল যাবত এটা তার মা ব্যবহার করেছে। আর হ্যাঁ, রাস্তায় দুটি ঘোড়ার গাড়ি ভয়ানক গতিতে ছুটাছুটি করছিলো। তখন রাস্তা দিয়ে এলোপাতাড়ি দৌড়াতে গিয়ে মেয়েটি তার চটি হারিয়ে ফেলেছে।

চটির এক পাটি কোথাও খুঁজে পেল না মেয়েটা। দেখতে পেলো, অন্য পাটি রাস্তার একটা ছেলের হাতে। ছেলেটি চটি নিয়ে পালিয়ে গেল, যেমনটি ছেলেবেলায় সবাই করে থাকে। নিরুপায় হয়ে ছোট্টো কুমারী মেয়েটি খালি পায়েই হাঁটতে লাগলো। ছোট ছোট পা! ঠাণ্ডায় তার পা রক্তবর্ণ হয়ে গেলো, নীলচে হয়ে গেলো!

তার পুরোনো এপ্রনের মধ্যে কিছু দিয়াশলাই ছিলো, হাতে ছিলো আরেক বান্ডিল। সারাদিনে কেউ একটাও কিনলো না ওর কাছ থেকে। তাই সেদিন সে চারআনা পয়সাও রোজগার করতে পারেনি। ঠাণ্ডা আর ক্ষুধায় বেচারী হামাগুড়ি দিয়ে কাঁপছিলো। দৃশ্যটা দেখতে কী যে খারাপ লাগে!

তার কাঁধের উপর কোঁকড়ানো চুলে তুষারের স্তর জমা হতে লাগলো। কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তার লক্ষ্য রাস্তার পাশের বাড়িগুলোর জানালা থেকে আসা উজ্জ্বল মোমবাতির আলো আর রান্না করা সুস্বাদু রাজহাঁসের রোস্টের গন্ধের প্রতি।

মেয়েটি দুটি বাড়ির মাঝে দেয়ালের পাশে হাত পা কাছে টেনে জড়সড় হয়ে বসে পড়লো। কিন্তু তার ঠাণ্ডা যেন আরো বেড়ে গেলো।  বাড়ি ফিরে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না ওর! কেননা দিয়াশলাই বেচে কোনো রোজগার হয়নি আজ, তাই বাড়ি গেলে নির্ঘাত বাবার হাতে মার খাবে। তাছাড়া সেখানে ঠাণ্ডাও বেশি। বাড়িতে শুধু একটি ছাদ ছিলো। খড় আর পুরানো জামা দিয়ে আটকানো বেড়ার বড় ছিদ্র দিয়ে হুহু করে বাতাস ঢোকে।

তার ছোট হাত দুটি ঠাণ্ডায় প্রায় জমে গেলো। দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালালে কিন্তু নিজেকে গরম রাখতে পারে।

সে একটি কাঠি নিল।

ফুসসসস! বাহ! সুন্দর জ্বলে উঠলো। কাঠিটি পুড়ছে। এটি মোমবাতির মতই উজ্জ্বল শিখায় জ্বলছে। মেয়েটি তার হাত আগুনের উপর রাখলো। বেশ দারুণ আলো! সে ভাবতে লাগলো, পিতলের মুকুট লাগানো আর পিতলে মোড়া পা-দানি দেওয়া লোহার উনুনের পাশে সে বসে আছে। আলোটা যেন তাকে উষ্ণ রাখতেই জ্বলছে। যেই না সে পা গরম করতে উনুনের কাছে গেল, অমনি কাঠি নিভে গেল। সাথে সাথে তার গরম  লোহার চুলার স্বপ্নও ভেঙে গেল। হাতে পরে রইল পোড়া দিয়াশলাইয়ের কাঠি।

আরেকটা কাঠি ঘষা দিল সে। জ্বলে উঠল এটি। আবারো সে ভাবতে লাগল। দেয়ালের যেখানে আলো পড়েছে সেখান থেকে যেন একটা যবনিকা সরে যাচ্ছে। দেয়ালটা স্বচ্ছ হয়ে পড়লো। তার ভিতর দিয়ে মেয়েটি ঘরের দৃশ্য দেখছিল। একটি টেবিল। টেবিলের উপরে তুষারশুভ্র টেবিলক্লথ ছড়ানো। টেবিলে জমকালো চিনামাটির পাত্র রাখা। পাত্রের ভিতর থেকে আপেল আর শুকনো বড়ই মেসানো রাজহাঁসের রোস্ট গরম বাষ্প ছড়াচ্ছে। এবার সে দেখলো, হাঁসের রোস্ট যেন একপায়ে লাফ দিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। রোস্টের বুকে কাঁটা চামচ আর ছুরি ঢুকানো। সেটি গড়িয়ে গড়িয়ে তার কাছে আসতেই দিয়াশলাইয়ের কাঠি নিভে গেল। পরে রইল শুধু ভিজে মোটা দেওয়াল।

সে আবার একটি কাঠি জ্বালাল। এবার সে নিজেকে আবিষ্কার করল জাঁকালো বিশাল খ্রিস্টমাস গাছের নিচে, যা দোকানে বিক্রি করতে রাখা গাছের চেয়েও বেশি সাজানো। গাছটির সবুজ শাখায় হাজার হাজার আলো জ্বলছে, আর ঝুলানো আছে রংবেরঙের ছবি। এমন ছবি সে দোকানের জানলা দিয়ে দেখেছে। ছবিগুলো তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। যেই না সে ছবিগুলো ছুঁতে যাবে, অমনি কাঠি নিভে গেলো। খ্রিস্টমাস গাছের আলোগুলো যেন অনেক উপরে উঠে স্বর্গের তারা হয়ে গেলো।

একটি তারা আলো ছড়াতে ছড়াতে খসে পড়লো।

“কেউ একজন মারা গেছে” মেয়েটি বললো।

তার বৃদ্ধা ঠাকুরমা তাকে বলেছিল যে, একটি আত্মা যখন ঈশ্বরের কাছে যায়, তখন একটি তারা খসে পড়ে।

ঠাকুরমা তাকে খুব ভালবাসতো, কিন্তু তিনি আর নেই।

সে আবার আরেকটি কাঠি জ্বালালো। আবার আলো। সেই আলোর মাঝে ভেসে আছেন উজ্জ্বল দ্যুতিময় বৃদ্ধা ঠাকুরমা। তার চোখে মুখে সেই আগেকার ভালবাসা।

“ঠাকুরমা” ডুকরে কেঁদে উঠলো সে।

“আমাকে তোমার সাথে নিয়ে চলো। কাঠি পুড়ে শেষ হতেই তুমি চলে যাও! উনুনের মত, রোস্টের মত আর বিশাল খ্রিস্টমাস গাছের মত তুমি অদৃশ্য হয়ে যাবে!” সে বলল ঠাকুরমাকে।

ঠাকুরমাকে কাছে রাখতে তাই সে তার হাতের দিয়াশলাই বান্ডিলের সব কাঠি ঘষে জ্বালালো। দিনের আলোর চেয়েও বেশি আলো ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। ঠাকুরমাকে খুব সুন্দর আর অনেক লম্বা লাগছিল। আগে কখনো তাকে এত সুন্দর দেখায়নি। ঠাকুরমা মেয়েটিকে তার কোলে নিলেন। দুজনে আলোয় ভেসে অনেক উপরে চলে গেলেন, অনেক উপরে। যেখানে কোনো ঠাণ্ডা নেই, নেই ক্ষুধা আর যন্ত্রণা। শুধু ঈশ্বর ছিলেন তাদের সাথে।

………………………………

সকাল হয়ে গেলো। ঠাণ্ডা সকাল। মেয়েটি সেখানেই পড়ে আছে। স্বচ্ছ দেওয়াল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অবলোকন করা মেয়ে সে। তার ঠাণ্ডা গোলাপি গালে হাসি ফুটে আছে।

অসাড় নিথর মেয়েটি দিয়াশলাই নিয়ে পড়ে আছে। এক বান্ডিল দিয়াশলাই পোড়া। লোকে মনে করলো, দিয়াশলাই দিয়ে সে নিজেকে গরম রাখতে চেয়েছিলো। কিন্তু কেউই বিন্দুমাত্র ধারণা করতে পারলো না কী মজার জিনিস সে দেখেছে।

কেমন মজায় সে আর ঠাকুরমা নতুন বছর পালন করেছে!

মূল –
The little match girl by Hans Christian Andersen

একটি মন্তব্য “দ্যা লিটল ম্যাচ গার্ল – Hans Christian Anderson এর ছোটো গল্প

প্রত্যুত্তর দিন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *