সংরক্ষণকারী যন্ত্র (ফিলিপ কে. ডিকের গল্প)

লেখক পরিচিতি:  [মূল অনুবাদ গল্পে যাবার আগে লেখক ফিলিপ কে. ডিক সম্পর্কে দুটো কথা বলা প্রয়োজন। তাঁর পরিচয় হচ্ছে, তিনি একজন আমেরিকান সাহিত্যিক। তাঁর প্রায় সব গল্পই বিজ্ঞানভিত্তিক কল্প-কাহিনী ক্যাটাগরিতে পড়ে। এটা আশ্চর্যের বিষয় হবে না যদি এই অসাধারণ সাহিত্যিকের নাম আপনি কস্মিনকালেও শুনে না থাকেন। কিন্তু এটা বাজি ধরে বলা যায়, এই প্রতিভাবান ব্যক্তির কোনো না কোনো কর্মের সাথে আপনি পরিচিত। হলিউড মুভি ইন্ডাস্ট্রি যে কী পরিমাণ ঋণী এই ব্যক্তির নিকট, সেটা যারা সায়েন্স-ফিকশন ঘরানার শিল্প-কর্মের নিয়মিত খোঁজ রাখেন তারাই জানেন। আপনার দেখা প্রতি ৭ টা হলিউডি সাই-ফাই মুভির একটা এই ব্যক্তির লেখা। কয়েকটার নাম বলি?

যেমন ধরুন- ১৯৮২ সালে রিডলী স্কট পরিচালিত এবং হ্যারিসন ফোর্ড অভিনীত ‘Blade Runner’, যেটা এখনো ক্লাসিক সাই-ফাই মুভির আওতায় পড়ে। সেটা নির্মিত হয়েছিলো ডিকের লেখা উপন্যাস ‘ডু অ্যান্ড্রয়েড ড্রিমস অব ইলেক্ট্রিক শীপ’ অবলম্বনে। জীবনে একবার হলেও মুভিটা দেখার চেষ্টা করুন। আর সবচেয়ে ভালো হয় বইটা পড়তে পারলে। এর পরে আসে ১৯৯০ সালে নির্মিত ‘Total Recall’ মুভি, যেটাতে অভিনয় করেছিলেন আর্নল্ড শোয়ার্জেনেগার। এর পরের মুভিটাকেও অনেকেই চিনবেন। সেটা হচ্ছে ২০০২ সালে স্টিফেন স্পিলবার্গ নির্মিত ‘Minority Report’, যেটায় অভিনয় করেছিলেন টম ক্রুজ। তারপরে আসে ‘Pay check’ মুভিটার কথা। ২০০৩ সালে নির্মিত এই মুভিতে অভিনয় করেছিলেন বেন অ্যাফ্লেক। এরপরে বলা যায় ২০০৭ সালে নির্মিত ‘Next’ মুভিটার নাম, যেটায় অভিনয় করেছিলেন নিকোলাস কেইজ। এছাড়াও আরো গাদা-গাদা মুভি আছে যেগুলো সব তার লেখা গল্প বা উপন্যাসকে একটু এদিক-সেদিক করে সাজিয়ে নির্মাণ করা।

কথা হচ্ছে- অসম্ভব প্রতিভাবান এই লেখক মারা গিয়েছিলেন ১৯৮২ সালে সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায়, বিনা চিকিৎসায়; হ্যারিসন ফোর্ড অভিনীত ‘ব্লেড রানার’ মুভিটা মুক্তির মাত্র মাস কয়েক আগে। এখন তারই রেখে যাওয়া স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করে হলিউড মাল্টি বিলিওন ডলারের ব্যবসা করছে। কিন্তু তার নাম কেউ মনে রাখেনি। একজন সায়েন্স-ফিকশন ভক্ত হিসেবে এই ক্ষুদ্র অনুবাদটা উপস্থাপন করে অসাধারণ সব দর্শন, আধ্যাত্মবাদ এবং সামাজিক মূল্যবোধ ধারণকারী এই প্রতিভাবান সাহিত্যিককে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে পারলেই হয়তো তার প্রতি আমাদের অবহেলার সামান্য কিছুটা হলেও দায়মুক্তি হবে। তাহলে চলুন মূল গল্পে………

ফিলিপ কে. ডিক সম্পর্কে আরো জানতে হলে তার উইকিপিডিয়া পেইজে যেতে পারেন।

———————————————————————————–

মূল গল্প: The Preserving Machine

লেখক: ফিলিপ কে ডিক

———————————————————————————–

ডক ল্যাবরিন্থ লন চেয়ারে তার চোখ আধবোজা অবস্থায় হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। কম্বলটা টানা ছিলো তার হাঁটু পর্যন্ত।

“তো?” আমি শুধালাম। আমি বারবিকিউ এর অগ্নিকুণ্ডলীর সামনে দাঁড়িয়ে হাতগুলোকে উষ্ণ করে নিচ্ছিলাম। দিনটা ছিলো বেশ পরিষ্কার ও ঠাণ্ডা। লস এঞ্জেলস এর রৌদ্রজ্জ্বল আকাশটা ছিলো প্রায় মেঘ-মুক্ত। ল্যাবরিন্থের নিরহংকারী বাড়িটার পেছনে সবুজের এক শান্ত ঢেউ খেলানো বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্রসারিত হয়ে পড়েছিলো দূর পাহাড় পর্যন্ত – ছোট্ট একটা বন যা শহরের সীমার ভিতরে এক ধু ধু প্রান্তরের মত বিভ্রম সৃষ্টি করেছিলো। “তো?” আমি বললাম, “যন্ত্রটা আপনার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাজ করেছে তাহলে?”

ল্যাবরিন্থ জবাব দিলেন না। আমি ফিরে তাকালাম। বৃদ্ধ মানুষটা গভীর ভাব নিয়ে সামনে তাকিয়ে ছিলেন, দেখছিলেন মেটে-বর্ণের এক ধাড়ি গুবরে পোকাকে তার চাদরের কিনার বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে। গুবরে পোকাটা বেশ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই উঠছিলো, তার শূন্য মুখটায় আত্ম-গৌরব ধরে রেখে। সেটা শীর্ষ অঞ্চল অতিক্রম করলো এবং দূর প্রান্তে একসময় হারিয়ে গেলো। আমরা আবার একা হয়ে পড়লাম।

ল্যাবরিন্থ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমার দিকে তাকালেন। “ওহ, এটা খুব ভালোভাবেই কাজ করেছে”।

আমি গুবরে পোকাটাকে খুঁজে বেড়ালাম, কিন্তু সেটাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলো না। বিকেলের পড়ন্ত সূর্যালোকে মৃদু একটা বাতাস আমার চারপাশে পাক খেয়ে উঠলো, ঠাণ্ডা এবং পাতলা। আমি বারবিকিউয়ের অগ্নিকুণ্ডলীটার আরো কাছ ঘেঁষে বসলাম।

“আমাকে সেটার ব্যাপারে একটু বলুন”, আমি বললাম।

ডক্টর ল্যাবরিন্থ, যারা বেশ পড়াশোনা করে এবং হাতে যাদের বেশ সময় আছে তাদের অনেকের মতো, বিশ্বাস করে ফেলেছিলেন যে আমাদের সভ্যতার পরিণতি ঠিক রোমের মত হতে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, তিনি ঠিক একই ধরণের একটা ফাটল তৈরি হতে দেখতে পেয়েছিলেন, যেটা গ্রীস এবং রোমের মত প্রাচীন দুনিয়াকে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলেছিলো। তার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিলো যে আমাদের বর্তমান পৃথিবী, আমাদের সমাজও তাদেরটার মতই বিলীন হয়ে যাবে আর অন্ধকার এক সময় এসে উপস্থিত হবে।

এই চিন্তা আসার পরপরই ল্যাবরিন্থ সমাজের এই ওলট-পালটের মাধ্যমে পুনর্বিন্যাসের ফলে যে সমস্ত সুন্দর ও উপভোগ্য বস্তু হারিয়ে যাবার আশংকা আছে, সেগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করে দিলেন। তিনি ভেবেছিলেন শিল্প, সাহিত্য, রীতিনীতি, সঙ্গীত এবং বাকী সবকিছুর কথা যেগুলো হারিয়ে যাবে। এবং তার কাছে মনে হয়েছিলো এতসব মহান এবং রুচিশীল বস্তুর মাঝে সঙ্গীতটাই মনে হয় সবচেয়ে বেশী হারিয়ে যাবে এবং বিস্মৃতও হয়ে পড়বে খুব দ্রুত।

সঙ্গীত হচ্ছে সব জিনিসের মাঝে সর্বাপেক্ষা বেশী বিলুপ্ত-ক্ষম বস্তু। কোমল এবং ভঙ্গুর, সহজেই ধ্বংস-ক্ষম।

ল্যাবরিন্থ এটা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ তিনি সঙ্গীত ভালোবাসতেন। কারণ তিনি এই ব্যাপারটা ঘৃণা করতেন যে একদিন আর কোনো ব্রামস এবং মোজার্ট থাকবে না। থাকবে না কোনো শয়নকক্ষে বাজতে থাকা মৃদু সঙ্গীতের মূর্ছনা, যেটাকে তিনি পাউডারবিশিষ্ট পরচুলা আর বাঁকানো সব বো-টাইয়ে ভরপুর স্বপ্নের সাথে যোগ করতে পারবেন না, যেখানে লম্বা-সরু মোমবাতিরা অস্পষ্ট আলো-আঁধারিতে ক্রমাগত গলে যাচ্ছে।

সঙ্গীত ব্যতীত কী এক শুষ্ক ও দুর্দশাময় জগত হবে সেটা! কী ধূসর এবং অসহনীয়।

ঠিক এভাবেই তার মাথায় এসেছিলো সংরক্ষণকারী যন্ত্রের কথা। এক সন্ধ্যায় যখন তিনি বসার ঘরের আরামকেদারাটায় নিচু স্বরে গ্রামোফোন ছেড়ে দিয়ে বসে ছিলেন, একটা কল্পনা ভেসে উঠলো তার মনে। তার মনে ভেসে উঠলো এক অদ্ভুত দৃশ্য। শুবার্ট ত্রয়ীর শেষ স্কোরটা, একদম শেষ একটা কপি, নষ্ট-ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে এক নোংরা স্থানের মেঝেতে, হয়তো সেটা একটা মিউজিয়াম।

একটা বোমারু বিমান মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলো। বোমা পড়লো, মিউজিয়ামটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলো, দেয়ালের চুন-সুরকিরা আর্তনাদ করতে করতে ধ্বসে পড়লো। সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেলো শেষ স্কোরটা, হারিয়ে গেলো আবর্জনার তলে পঁচতে এবং বিলুপ্ত হতে।

আর তখনই, ডক ল্যাবরিন্থের কল্পনায়, তিনি দেখতে পেলেন সেই স্কোরটা মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে আসছে, ঠিক মাটিচাপা পড়া ছুঁচোর মত। সত্যি বলতে গেলে, ছুঁচোর মতই ত্বরিৎ গতির, নখর ও ধারালো দন্তবিশিষ্ট এবং ভয়ানক শক্তিসম্পন্ন ছিলো সেটা।

বেঁচে থাকার তাগিদের মতো সাধারণ, দৈনন্দিন জীবনের সহজপ্রবৃত্তি যা সকল পোকামাকড় এবং ছুঁচোর মত প্রাণীদের আছে, সঙ্গীতেরও যদি সেই ক্ষমতা থাকতো, তবে বাস্তবতাটা কী ভিন্নই না হতো! যদি সঙ্গীতকে জীবন্ত প্রাণীতে রূপান্তরিত করা যায়, সেইসব প্রাণী যাদের নখর এবং দাঁত আছে, তাহলে হয়তো এটা টিকেও যেতে পারে। যদি কোনোভাবে একটা যন্ত্র তৈরি করা যেতো, এমন এক যন্ত্র যা সঙ্গীতের স্কোরগুলোকে জীবন্ত প্রাণীতে রূপান্তরিত করবে।

কিন্তু ডক ল্যাবরিন্থ কোনো মেকানিক ছিলেন না। তিনি পরীক্ষামূলক ভাবে কয়েকটি স্কেচ তৈরি করলেন আর সেগুলো অনেক আশা নিয়ে পাঠিয়ে দিলেন আশেপাশের গবেষণাগারগুলোতে। এগুলোর বেশীরভাগই যথারীতি তখন যুদ্ধসংক্রান্ত গবেষণার চুক্তি নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। কিন্তু অবশেষে তিনি খুঁজে পেলেন তার পছন্দসই ব্যক্তিদের। মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের এক বিশ্ববিদ্যালয় তার পরিকল্পনা দেখে খুশী হয়েছিলো এবং তারা যন্ত্রটা নির্মাণ শুরুর ব্যাপারে সেই মুহূর্তেই কাজে নামতে রাজী ছিলো।

কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলো। অবশেষে ল্যাবরিন্থ বিশ্ববিদ্যালয় হতে একটা পোস্টকার্ড পেলেন। যন্ত্রটার নির্মাণ বেশ ভালোমতোই এগিয়ে চলছে; প্রকৃতপক্ষে, এর কাজ প্রায় শেষের দিকে। তারা যন্ত্রটাকে পরীক্ষামূলক ভাবে চালিয়ে দেখেছেন এতে জনপ্রিয় কিছু সঙ্গীত ভরে দিয়ে। ফলাফল? দুটো ইঁদুর-সদৃশ প্রাণী বেরিয়ে এসে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছিলো পুরো ল্যাবরেটরিতে, যতক্ষণ পর্যন্ত না একটা বেড়াল এসে সেগুলোকে ধরে খেয়ে ফেলেছিলো। কিন্তু যন্ত্রটা ছিলো তার কাজে সফল।

এই ঘটনার কিছুদিন বাদেই যন্ত্রটা তার কাছে এসে পৌঁছুলো, কাঠের বাক্সে সযত্নে বন্দী করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভালোভাবে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায়। তিনি বেশ উৎসাহী হয়ে কাঠের পাটাতনগুলো খুলতে নেমে পড়লেন। অনেক ভাসাভাসা দৃশ্যপট নিশ্চয়ই তার কল্পনায় উড়ে আসছিলো যখন তিনি এর নিয়ন্ত্রণকারী অংশগুলোকে জোড়া লাগাতে ব্যস্ত ছিলেন আর প্রথম রূপান্তর কার্যের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তিনি যাত্রার শুরুতেই এক মহামূল্যবান স্বরলিপিকে বাছাই করলেন, মোজার্টের জি মাইনর।

পঞ্চস্বর। তিনি কিছুটা সময় খাতার পাতা ওলটাতে লাগলেন, ভাবনার অতল গভীরে হারিয়ে গিয়ে, মন উড়ে গিয়ে বহুদূর। অবশেষে তিনি খাতাটা নিয়ে গেলেন মেশিনের কাছে আর ভেতরে ফেলে দিলেন সেটা।

সময় গড়িয়ে গেলো। যখন তিনি কম্পার্টমেন্টটা খুলবেন তখন আসলে কী তাকে অভিবাদন জানাবে সেটা ভেবে একটু উদ্বিগ্ন, শঙ্কিত এবং অনিশ্চিতভাবেই ল্যাবরিন্থ দাঁড়িয়ে রইলেন যন্ত্রটার পাশে। তার মনে হলো, তিনি একইসাথে একটা চমকপ্রদ এবং করুণ কাজ করছেন। মহান সুরকারদের সুরগুলোকে চিরদিনের জন্যে তিনি সংরক্ষণ করতে চলেছেন। তার প্রাপ্য প্রশংসাটুকু তাহলে কী হবে? তিনি আসলে কোন সত্যের মুখোমুখি হবেন? কাজটা শেষ হবার আগে কী রূপ ধারণ করবে ব্যাপারটা?

অনেক প্রশ্ন, যাদের কোনো সদুত্তর নেই। যখন তিনি গভীর ধ্যানে আচ্ছন্ন ছিলেন তখনো যন্ত্রের লাল বাতিটা জ্বলজ্বল করে যাচ্ছিলো। এক সময়ে প্রক্রিয়াটা সম্পন্ন হলো, চূড়ান্ত রূপান্তর ঘটে গেলো যন্ত্রের ভেতরে। তিনি দরজাটা খুললেন।

“হায় ঈশ্বর?” তিনি বলে উঠলেন। “এ তো দেখি ভীষণ সাংঘাতিক”।

কোনো জন্তু নয়, বরং একটা পাখি বেরিয়ে এলো। মোজার্ট পাখিটা ছিলো ভীষণ সুন্দর, ছোট্ট আর হালকা। সারা শরীর-জুড়ে ছিলো ময়ূরের মতো পালক। এটা ঘরের এমাথা-ওমাথা কিছুটা দৌড়ালো, তারপর তার দিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে এলো, উৎসুক এবং বন্ধু-ভাবাপন্ন হয়ে। শিহরিত হয়ে ডক ল্যাবরিন্থ হাত বাড়িয়ে শরীর মাটির দিকে ঝুঁকিয়ে বসলেন। মোজার্ট পাখিটা আরো কাছে এলো। তারপরই হঠাৎ করে ক্ষিপ্র গতিতে ওটা বাতাসে ডানা ঝাপটাতে লাগলো।

“অসাধারণ”, তিনি বিড়বিড় করে বললেন। তিনি অতি কোমল ও শান্তভাবে পাখিটাকে প্রলুব্ধ করতে লাগলেন তার দিকে, এবং অবশেষে এটা ডানা ঝাপটে তার কাছে চলে এলো। ল্যাবরিন্থ অনেকক্ষণ ধরে সেটাকে আঙ্গুল দিয়ে আদর করলেন, আর গভীরভাবে ভাবতে লাগলেন। বাকীরা তাহলে দেখতে কেমন হবে? তিনি কোনো ধারণাই করতে পারলেন না। অতি সযত্নে মোজার্ট পাখিটাকে তুলে নিলেন এবং একটা বাক্সে রেখে দিলেন সেটাকে।

তিনি পরের দিন আরো হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন যখন বিটোফেন গুবরে-পোকাটা বেরিয়ে এসেছিলো, দৃঢ়তা এবং আত্ম-গৌরবের সাথে। এটাই ছিলো সেই গুবরে-পোকা যেটাকে একটু আগে আমি দেখেছিলাম তার শরীরের লাল চাদর বেয়ে বেয়ে উঠতে, একাগ্রচিত্তে এবং পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে উদাসীন হয়ে। হয়তো তার নিজের কোনো কাজেই যাচ্ছিলো সেটা।

এরপরে বের হয়ে এসেছিলো শুবার্ট জন্তু। শুবার্ট জন্তুটা ছিলো একটু বোকা-বোকা, সদ্য শৈশব পেরুনো ভেড়া-সদৃশ প্রাণী যেটা এদিক-সেদিক বোকার মত লাফিয়ে বেড়াচ্ছিলো আর খেলতে চাইছিলো। ল্যাবরিন্থ তখন সেখানেই বসে কিছু গভীর ভাবনা ভাবতে শুরু করেছিলেন।

এদের টিকে থাকার বৈশিষ্ট্যগুলো কী হওয়া দরকার? রঙিন পালক কি নখর এবং ধারালো দাঁতের চেয়ে উত্তম? ল্যাবরিন্থ বিমূঢ় হয়ে রইলেন। তিনি আশা করেছিলেন এক ঝাঁক নির্ভীক গর্ত-বাসী প্রাণীকে, যাদের আছে নখর এবং শল্কযুক্ত চামড়া। তারা মাটি খুঁড়ছে, লড়াই করছে, আঁচড়ে-কামড়ে দিতে এবং কষে লাথি বসাতে প্রস্তুত থাকছে। তিনি কী আসলেই সঠিক জিনিসটা পাচ্ছেন? তথাপি, কেইবা বলতে পারে টিকে থাকার জন্যে আসলে কী প্রয়োজন? – ডাইনোসরেরাও ছিলো এমন সব অস্ত্রে সুসজ্জিত, কিন্তু তাদের কেউই আর এখন বেঁচে নেই। কিন্তু যাই হোক, যন্ত্রটা তো এখন প্রস্তুত; আর নতুন করে শুরু করার জন্যেও বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

ল্যাবরিন্থ তাই এগিয়ে চললেন। সংরক্ষণকারী যন্ত্রটাকে একের পর এক অসংখ্য সুরকারের সুর গেলাতে লাগলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার বাড়ির পেছনের জঙ্গলটা হামাগুড়ি দিয়ে চলা, ভ্যাঁ-ভ্যাঁ ডাক ছাড়া সব প্রাণীতে ভর্তি হয়ে গেলো যারা রাতভর চেঁচামেচি আর ধুপ-ধাপ আওয়াজ করতো। এদের মাঝে অনেক সাংঘাতিক বস্তুও বেরিয়ে এসেছিলো, এমন সব সৃষ্টি যেগুলো তাকে আঁতকে উঠতে এবং বিস্মিত হতে বাধ্য করেছিলো। বিস্তৃত এবং থালা-সদৃশ এক শতপদী ব্রামস পোকাটার ছিলো অনেকগুলো পা, যেগুলো ছিলো চারদিকে ছড়ানো। এটা ছিলো খুবই নিচু এবং চ্যাপ্টা, আর আবৃত ছিলো সুষম দৈর্ঘ্যের লোমে। ব্রামস পোকাটা নিজের মতো করে থাকতে চেয়েছিলো, এবং তাই চটজলদি করে বিশাল যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে এড়িয়ে গেলো ওয়েগনার জানোয়ারটাকে, যেটা তার একটু আগেই বেরিয়ে এসেছিলো।

ওয়েগনার জানোয়ারটা ছিলো বেশ বড় এবং গাড় রঙ ছড়ানো-ছিটানো ছিলো তার গায়ে। এর মেজাজটা বেশ ভারীই মনে হয়েছিলো এবং ডক ল্যাবরিন্থ এ কারণে বেশ চিন্তিতও ছিলেন। ঠিক ঐ এক-দঙ্গল ব্যাশ কীটসমূহের মতো, যারা ছিলো গোল গোল বল আকৃতির প্রাণী, কিছু বড়, কিছু ছোট। যাদেরকে পাওয়া গিয়েছিলো ‘ফোরটি-এইট প্রিল্যুডস অ্যান্ড ফিউগস’ সুরটা হতে। আর অন্যান্য আরো বহু সংখ্যকদের পাশাপাশি সেখানে ছিলো স্ট্রাভিনস্কি পাখি, কৌতূহল উদ্দীপক অনেক খণ্ড খণ্ড অংশের সমন্বয়ে গঠিত।

তাই তিনি তাদেরকে চলে যেতে দিলেন বনের দিকে এবং তারা গেলোও বটে। কেউ টিং-টিং করে ঝাঁপিয়ে, কেউ গড়িয়ে, কেউ লাফিয়ে- যে যেভাবে পারলো। কিন্তু ইতোমধ্যেই ব্যর্থতার এক অনুভূতি তার উপর ভর করেছিলো। যতবারই একটা করে প্রাণী বেরিয়ে এসেছিলো ততবারই তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন; মনে হচ্ছিলো ফলাফলের উপরে তার কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। ব্যাপারটা তার ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনো এক শক্তিশালী ও অদৃশ্য সূত্রের হাতে পড়েছিলো, যে অতি সূক্ষ্মভাবে পুরো জিনিসটা কব্জায় নিয়ে ফেলেছিলো এবং এই ব্যাপারটা তাকে বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলেছিলো। প্রাণীগুলো এক সুগভীর, নৈর্ব্যক্তিক শক্তির সামনে বিকৃত হয়ে বদলে যাচ্ছিলো। এমন এক শক্তি যেটাকে ল্যাবরিন্থ দেখতেও পারছিলেন না, বুঝতেও পারছিলেন না। এবং এটা তাকে ভীত করে তুলেছিলো।

ল্যাবরিন্থ কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমি কিছুটা সময় অপেক্ষা করলাম, কিন্তু তাকে দেখে মনে হলো – তিনি আর আগে বাড়তে রাজী নন। বৃদ্ধ মানুষটি বরং আমার দিকে অদ্ভুত ও সরল চোখে চেয়ে রইলেন।

“আমি সত্যিই আর কিছু জানি না”, তিনি বললেন। “আমি বনটায় আর ফিরে যাইনি অনেক সময় হয়ে গেলো। আমি ওখানে যেতে ভয় পাচ্ছি। আমি জানি কিছু একটা ঘটছে সেখানে, কিন্তু –”

“দুজনে একসাথে গিয়েই দেখি না হয়?”

তিনি একটা স্বস্তির হাসি হাসলেন। “সত্যিই? আমি মনে মনে আশা করছিলাম যাতে তোমার কাছ থেকেই প্রস্তাবটা আসে। এই ব্যাপারটা আমাকে ভেতরে ভেতরে কুরে খাচ্ছিলো”। তিনি তার গা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে চাদরটা খুলে একপাশে রাখলেন। “চলো যাই তবে”।

আমরা বাড়ির কিনার ধরে হেঁটে একটা সরু পথ ধরে বনটায় ঢুকলাম। সবকিছুই ছিলো বুনো এবং বিশৃঙ্খল, মাত্রা-ছাড়াভাবে গজিয়ে ওঠা এবং জট পাকানো, উস্কো-খুস্কো, যত্ন হীনভাবে বেড়ে ওঠা সবুজের বিশাল এক সমুদ্র। ডক ল্যাবরিন্থ পথের উপরে ছড়িয়ে থাকা ডাল-পালাগুলোকে একপাশে ঠেলে প্রথমে ভিতরে ঢুকলেন, সম্মুখে ঝুঁকে এবং দেহটাকে মুচড়িয়ে যাতে সহজেই পার হয়ে যাওয়া যায়।

“বেশ তো জায়গাটা” আমি লক্ষ্য করে বললাম। আমরা কিছুটা সময় ভেতরে ঢুকতে ব্যয় করলাম। বনটা বেশ অন্ধকার এবং স্যাঁতস্যাঁতে। সূর্যাস্ত প্রায় ঘনিয়ে এসেছিলো, আর হালকা এক কুয়াশা মাথার উপরের পাতাগুলোকে পাশ কাটিয়ে আমাদের উপরে নেমে আসতে শুরু করেছিলো।

“এখানে কেউ আসে না”। হঠাৎ ডক থেমে গেলেন, তাকালেন চারপাশে। “সবচেয়ে ভালো হয় আমরা ফিরে গিয়ে আমার বন্দুকটা নিয়ে আসলে। আমি চাই না এখানে কোনো কিছু ঘটুক”।

“আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে যে আপনি নিশ্চিত ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে”। আমি হেঁটে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। “আপনি যতটা খারাপ ধারণা করছেন ব্যাপারটা তত খারাপ নাও হতে পারে”।

ল্যাবরিন্থ চারপাশে তাকালেন। তিনি পা দিয়ে কিছু লতা-গুল্ম একপাশে ঠেলে দিলেন। “তারা সবাই আমাদের আশে-পাশেই আছে, সবদিকে। আমাদের দেখছে। তুমি টের পাচ্ছো না কিছু?”

আমি অন্যমনস্ক হয়ে মাথা নাড়লাম। “এটা কী?” আমি একটা ভারী, ছাতা-ধরা ডাল তুলে ধরলাম, যেটা হতে ছত্রাকের কণারা ঝরে ঝরে পড়ছে। আমি সেটাকে পথ থেকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। একটা প্রসারিত, বিশেষ আকার এবং পরিচয় বিহীন কীসের স্তূপ নরম মাটিতে অর্ধ-নিমগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে।

“এটা কী জিনিস?” আমি আবার বললাম। ল্যাবরিন্থ নীচে তাকালেন, তার চেহারা একইসাথে শক্ত এবং অসহায় হয়ে পড়লো। তিনি স্তূপটাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে লাথি মারতে শুরু করলেন। আমি একটু অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলাম। “ঈশ্বরের দোহাই, বলুন এটা কী জিনিস?” আমি বললাম। “”আপনি কি জানেন?”

ল্যাবরিন্থ ধীরে ধীরে ঘাড় তুলে আমার দিকে তাকালেন। “এটা হচ্ছে সেই শুবার্ট জন্তুটা”, তিনি বিড়বিড় করলেন। “কিংবা বলা যায় ‘ছিলো’, কোনো একসময়। এখন আর এটার বিশেষ কিছুই অবশিষ্ট নেই”।

সেই শুবার্ট জন্তু- যেটা দৌড়েছিলো এবং লাফ-ঝাঁপ করেছিলো একটা কুকুরছানার মতো, বোকাটে স্বভাবের, আর সবসময় খেলতে চাইতো। আমি হাঁটু মুড়ে বসে তাকালাম স্তূপটার পানে, কয়েকটা পাতা আর প্রশাখা ওটার গা হতে সরিয়ে দিলাম। এটা যে মৃত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুখটা ছিলো হাঁ করা, শরীরটা ছিঁড়ে দু’ফালি করা। পিঁপড়ে এবং কীটেরা ইতোমধ্যেই কাজ করতে শুরু করে দিয়েছিলো, সীমাহীন পরিশ্রম করে যাচ্ছিলো এটাকে নিয়ে। এটা গন্ধও ছড়াতে শুরু করেছিলো।

“কিন্তু হয়েছিলো কী?” ল্যাবরিন্থ বললেন। তিনি মাথা ঝাঁকালেন। “কিসে এমন কাজ করতে পারে?”

একটা শব্দ হলো। আমরা ঝটকে ফিরে তাকালাম।

এক মুহূর্তের জন্যে আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না। তারপরই ঝোপটা নড়ে উঠলো, আর প্রথমবারের মতো আমরা সেটার আকৃতি উপলব্ধি করতে পারলাম। ওটা নিশ্চয়ই ওখানে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখে যাচ্ছিলো পুরোটা সময়। প্রাণীটা ছিলো অতিকায়, সরু এবং লম্বা, সেই সাথে উজ্জ্বল, তীক্ষ্ম চোখ বিশিষ্ট। আমার কাছে ওটাকে মনে হলো নেকড়ের মত দেখতে, কিন্তু আরো ভারী। এর চামড়া ছিলো ভারী এবং পুরু, মুখটা ঈষৎ ফাঁক করে চেয়ে ছিলো নিঃশব্দে আমাদের দিকে। আমাদের পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো আমাদের এখানে দেখে বিস্মিত।

“সেই ওয়েগনার জন্তুটা”, ল্যাবরিন্থ ভরাট গলায় বললেন। “কিন্তু এটা বদলে গেছে। পুরোই বদলে গেছে। আমি এটাকে চিনতেই পারছি না”।

প্রাণীটা চটে গিয়ে বাতাসে নাক শুঁকতে লাগলো। তারপর আচমকা পেছন ফিরে ছায়াতে সরে গেলো, আর এক মুহূর্ত বাদেই হারিয়ে গেলো সেটা।

আমরা কিছুটা সময় নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলাম। অবশেষে ল্যাবরিন্থ নড়ে উঠলেন। “তাহলে এটাই ছিলো সে”, তিনি বললেন। “আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না। কিন্তু কেন? কী –”

“অভিযোজন”, আমি বললাম। “যখন আপনি সাধারণ একটা গৃহপালিত বেড়ালকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেন, সেটা বুনো হয়ে উঠে। অথবা কুকুরের ক্ষেত্রেও”।

“হ্যাঁ”। তিনি মাথা নাড়লেন। “একটা কুকুর আবারও নেকড়ের মতো হয়ে উঠে, বেঁচে থাকার তাগিদে। জঙ্গলের আইন। আমারও এটাই আশা করা উচিৎ ছিলো। এমনটা সবকিছুর ক্ষেত্রেই ঘটে”।

আমি মাটিতে পড়ে থাকা লাশটার দিকে তাকালাম, তারপর আবার ফিরে তাকালাম নিশ্চুপ সেই ঝোপটার দিকে। অভিযোজন –- কিংবা তার থেকেও খারাপ কিছু। একটা ধারণা আমার মাথায় গজিয়ে উঠতে শুরু করেছিলো, কিন্তু আমি কিছুই বললাম না। অন্তত তখনই না।

“আমি এদের আরো কয়টাকে দেখতে চাই”, বললাম আমি। “বাকীদের মধ্যে কয়েকটাকে। চলুন ঘুরেফিরে দেখি আরো কিছু”।

তিনি রাজী হলেন। আমরা সামনের শাখা-প্রশাখা এবং লতা-গুল্মকে পথ থেকে সরিয়ে দিয়ে ঘাস এবং আগাছার ভেতর দিয়ে পা ফেলে হাঁটতে শুরু করলাম। আমি একটা লাঠি খুঁজে নিলাম, কিন্তু ল্যাবরিন্থ হাত এবং হাঁটুর উপর ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়লেন, মাটির কাছাকাছি চোখ এনে দেখতে লাগলেন। মাটির কাছে পৌঁছার এবং কিছু অনুভব করার চেষ্টা করতে লাগলেন।

“এমনকি শিশুরাও পশুতে পরিণত হতে পারে”, আমি বললাম। “আপনার মনে আছে ভারতের সেই নেকড়ে শিশুদের কথা? কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি তারা সাধারণ শিশু ছিলো”।

ল্যাবরিন্থ মাথা নাড়লেন। তার মনটা বিষণ্ণ ছিলো, এবং কারণটা বুঝাও কঠিন কিছু ছিলো না। তিনি ভুল ছিলেন, তার মূল ধারণাটা ভুল ছিলো। এবং এর ফলাফল সবেমাত্র তার কাছে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠতে শুরু করেছে। সুর জীবন্ত প্রাণী হিসেবে টিকে থাকতে পারতো, কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন স্বর্গের বাগানের সেই শিক্ষা: একবার একটা জিনিস তৈরি করা হয়ে গেলে সেটা নিজেই তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে শুরু করে, এবং এর স্রষ্টার সম্পদ হিসেবে গণ্য হওয়া ক্ষান্ত দিয়ে নিজের ইচ্ছানুযায়ী নিজেকে গড়ে তুলতে এবং নির্দেশনা দিতে থাকে। ঈশ্বর মানুষদের বেড়ে ওঠা দেখে নিশ্চয়ই একই ধরণের বিষণ্ণতা অনুভব করেছিলেন। ল্যাবরিন্থের মতো ঈশ্বরও একই ধরণের লজ্জা অনুভব করেছিলেন, যখন তাঁর সৃষ্টিদেরকে বেঁচে থাকার তাগিদে পাল্লা দিয়ে রূপান্তরিত হতে এবং বদলে যেতে দেখে দেখেছিলেন।

তার সুরময় প্রাণীদের টিকে থাকার আর কোনো মানে নেই তার কাছে। সৌন্দর্যের হিংস্রতায় পর্যবসিত হওয়া – ঠিক এটা ঠেকাতেই তিনি তাদের সৃষ্টি করেছিলেন, আর সেটাই ঘটছে এখন ওদের মধ্যে, পুরোপুরি তার চোখের সামনে। ডক ল্যাবরিন্থ হঠাৎ আমার মুখপানে চাইলেন, তার মুখ ভারাক্রান্ত। তিনি তাদের টিকে থাকাটা নিশ্চিত করেছিলেন, তা সত্যি, কিন্তু সেটা করতে গিয়ে তিনি পুরো মর্মার্থটাকেই মুছে দিয়েছেন, এর অন্তর্নিহিত সব মূল্যকেই ধূলিস্যাৎ করেছেন। আমি তার দিকে মৃদু হাসি ছোড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তিনি চকিতে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে নিলেন।

“এ নিয়ে এতো ভাববেন না”, আমি বললাম। “ওয়েগনার জন্তুটার জন্যে পরিবর্তনটা তেমন বিশাল কিছু ছিলো না। ওটা কি এমনিতেই কর্কশ এবং মেজাজী ছিলো না? ওটার কি হিংস্রতার প্রতি স্বাভাবিক প্রবণতা — ”

আমি থেমে গেলাম। ডক ল্যাবরিন্থ ঘাস হতে হাত ঝেড়ে সরিয়ে নিয়ে পিছনপানে ঝাঁপ দিলেন। তার কবজি শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন ব্যথায় কোঁকাতে কোঁকাতে।

“কী হয়েছে?” আমি ছুটে গেলাম। কাঁপতে কাঁপতে তিনি তার বয়সে জরাজীর্ণ হাতটাকে বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। “কী হলো? ঘটলোটা কী?”

আমি হাতটা উলটে নিলাম। হাতের পুরো পেছনটা জুড়ে ছিলো লাল কাটা দাগ, যেটা আমি তাকিয়ে থাকার সময়েও আরো ফুলে উঠছিলো। কিছু একটা হুল ফুটিয়েছে, অথবা কিছু একটা কামড়ে দিয়েছে তাকে ঘাসের ভেতর থেকে। আমি নীচে তাকিয়ে ঘাসগুলোকে লাথি মেরে সরাতে লাগলাম।

সেখানে কিছু একটা নড়ছিলো। একটা ছোট্ট সোনালি বল দ্রুতগতিতে গড়িয়ে গড়িয়ে ঝোপের দিকে ফিরে চলছিলো। এটা বিছুটি পোকার মত কাঁটা দিয়ে ঢাকা ছিলো।

“ধরো ওটা!” ল্যাবরিন্থ চেঁচিয়ে উঠলেন। “জলদি!”

আমি আমার রুমালটা বের করে ধরে ওটার পেছনে ধাওয়া করে গেলাম, কাঁটা এড়ানোর চেষ্টায়। গোলকটা উন্মত্তের মতো পালিয়ে যেতে চেষ্টা করছিলো, কিন্তু আমি সেটাকে অবশেষে রুমালে ধরে ফেলেছিলাম।

আমি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ল্যাবরিন্থ হাতের ভিতরে সংগ্রাম করতে থাকা রুমালটার পানে চেয়ে রইলেন। “আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না”, তিনি বললেন। “আমাদের মনে হয় ঘরে ফেরাটাই ভালো”।

“এটা কী জিনিস?”

“বাখ (সিবাশ্চিয়ান বাখ) পোকাগুলোর একটা। কিন্তু এটা বদলে গেছে……”

আমরা আঁধারে পথ হাতড়ে হাতড়ে ফিরতি পথ ধরে ঘরে ফিরে যেতে লাগলাম। আমি চললাম আগে আগে, ডাল-পালা সব সরিয়ে দিতে দিতে। আর ল্যাবরিন্থ চললেন পিছু পিছু, ভারী মেজাজে এবং অন্যমনস্কভাবে, তার হাত ডলতে ডলতে।

আমরা উঠোনে প্রবেশ করলাম আর বাড়ির পেছনের সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় গিয়ে উঠলাম। ল্যাবরিন্থ দরজাটা খুলে দিলেন আর আমরা রান্নাঘরে ঢুকলাম। তিনি বাতি জ্বালালেন আর তারপর ছুটলেন সিংকের দিকে তার হাত ভালোমতো ধুতে।

আমি কাবার্ড থেকে একটা খালি বয়াম নিয়ে সযত্নে বাখ পোকাটাকে এর ভিতরে ভরে রাখলাম। আমি ঢাকনিটা লাগাতে লাগাতে সোনালি বলটা রগচটা ভাবে এটার ভিতরে গড়াগড়ি খেতে লাগলো। আমি টেবিলের পাশে বসে পড়লাম। আমরা কেউই কোনো কথা বললাম না। ল্যাবরিন্থ সিংকের কাছে, তার হুল ফুটে যাওয়া হাতে ঠাণ্ডা পানি গড়াচ্ছে। আর আমি টেবিলে, অস্বস্তির সাথে চেয়ে আছি বয়ামের ভিতরে থাকা সোনালী বলটার দিকে। ওটা রাস্তা খুঁজছে কোনো না কোনোভাবে পালানোর জন্যে।

“তাহলে?” আমি অবশেষে বললাম।

“কোনো সন্দেহ নেই”। ল্যাবরিন্থ ফিরে এলেন আর আমার উল্টো পাশে বসে পড়লেন। “এটা অনেক রূপান্তরের মাঝ দিয়ে গেছে। শুরুতে এর কোনো বিষাক্ত কাঁটা ছিলো না। তুমি জানো, এটা খুব ভালো ব্যাপার ছিলো যে আমি আমার নূহের চরিত্রে বেশ ভালোভাবেই অভিনয় করেছিলাম”।

“কী বলতে চাইছেন?”

“আমি তাদের নপুংসক করে তৈরি করেছিলাম। তারা প্রজননে সক্ষম নয়। তাদের কোনো দ্বিতীয় প্রজন্ম নেই। তারা যখন মারা যাবে, সেটাই হবে এই ঘটনার চূড়ান্ত পরিণতি”।

“মানতেই হচ্ছে, আমি আনন্দিত যে আপনি এই ব্যাপারে ভেবেছিলেন”।

“আমি ভাবছি”, ল্যাবরিন্থ বিড়বিড় করলেন, “আমি ভাবছি এটার সুর কেমন হবে, এখন, ঠিক এভাবে”।

“কোনটা?”

“ঐ গোলক, বাখ পোকাটা। এটাই তো আসল পরীক্ষা, তাই নয় কি? আমি এটাকে যন্ত্রের ভিতরে ফেলে আবার আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে পারি। আমরা মনে হয় দেখতে পারি। তুমি কি দেখতে চাও নাকি?”

“আপনিই যা বলেন, ডক”, আমি বললাম। “এটা আপনার উপরে। তবে খুব বেশী উচ্চাশা করবেন না”।

তিনি বয়ামটা তুলে নিলেন সযত্নে আর আমরা চললাম নীচের তলায়, খাড়া সিঁড়ি বেয়ে সেলারের দিকে। আমি এক কোণায়, কাপড় ধোয়ার টাবের পাশে, অনুজ্জ্বল ধাতুর তৈরি কলামকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। একটা অদ্ভুত অনুভূতি বয়ে গেলো আমার ভেতর দিয়ে। এটাই ছিলো সেই সংরক্ষণকারী যন্ত্র।

“তাহলে এটাই সেই বস্তু”, বললাম আমি।

“হ্যাঁ, এটাই সেটা”। ল্যাবরিন্থ যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণগুলো চালু করলেন আর কিছুটা সময় সেগুলোকে নিয়ে কাজ করলেন। অবশেষে তিনি ফিরলেন বয়ামটার দিকে আর সেটাকে ধরলেন চোঙ্গার উপরে। তিনি সাবধানে ঢাকনাটা খুললেন, আর বাখ পোকাটা অনীহার সাথে পড়ে গেলো বয়াম হতে, যন্ত্রের ভিতরে। ল্যাবরিন্থ এরপরে চোঙ্গাটা বন্ধ করে দিলেন।

“এই শুরু হলো”, তিনি বললেন। তিনি কন্ট্রোলে ধাক্কা দিলেন আর মেশিনটা চলতে শুরু করলো। ল্যাবরিন্থ হাত হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। বাইরে রাত নেমে এসেছিলো, আলোকে তাড়িয়ে, সেটাকে চাপতে চাপতে অস্তিত্ব হতে বিলীন করে দিয়ে। অবশেষে যন্ত্রের গায়ে একটা নির্দেশক বাতিতে লাল রঙ জ্বলে উঠলো। ডক কন্ট্রোল বন্ধ করে দিলেন আর আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম নৈঃশব্দ্যে। কেউই নিজেকে যন্ত্র উন্মোচনকারী ব্যক্তি হিসেবে দেখতে চাচ্ছিলাম না।

“তাহলে?” আমি বললাম অবশেষে। “আমাদের মাঝে কে এটায় চোখ রাখবে?”

ল্যাবরিন্থ নড়ে উঠলেন। তিনি স্লট-পিসটাকে ঠেলে একপাশে সরিয়ে যন্ত্রের ভিতরে হাত পৌঁছালেন। তার হাত বেরিয়ে এলো একটা পাতলা শিট ধরা অবস্থায়, সঙ্গীতের একটা স্বরলিপি। তিনি ওটা আমাকে দিলেন। “এই হচ্ছে ফলাফল”, বললেন তিনি। “আমরা উপরে গিয়ে এটা বাজাতে পারি”।

আমরা উপরে ফিরে ঢুকলাম সংগীত কক্ষে। ল্যাবরিন্থ গ্র্যান্ড পিয়ানোর সামনে বসলেন আর আমি তাকে স্বরলিপিটা ধরিয়ে দিলাম। তিনি সেটা খুললেন আর এক মুহূর্ত শূন্য মুখে পর্যালোচনা করলেন, কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ ছাড়াই। তারপর তিনি সেটা বাজাতে শুরু করলেন।

আমি শুনলাম সুরটা। বীভৎস! আমি এর আগে কখনো এরকম কিছু শুনিনি। বিকৃত, নারকীয়, অর্থহীন! সম্ভবত একটা অযাচিত ও অপ্রতিভ রকমের অর্থ ছিলো, কিন্তু যেটার এখানে থাকারই কথা ছিলো না। এটা এককালে বাখের ঐকতান ছিলো, এক সুবিন্যস্ত এবং সু-সম্মানিত কর্ম ছিলো – সেটা বিশ্বাস করতে আমাকে খুব কষ্ট হচ্ছিলো।

“এতেই প্রমাণিত হয়ে গেলো”, ল্যাবরিন্থ বললেন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন, স্বরলিপিটা তুলে নিলেন তার হাতে, আর তারপর ছিঁড়ে কুটিকুটি করলেন সেটা।

যখন আমার গাড়ির পানে আমরা ফিরতি পথে নীচে নামছিলাম, আমি বললাম, “আমার ধারণা টিকে থাকার সংগ্রামের পেছনের শক্তিটা হয়তো মানুষের যেকোনো মূল্যবোধের চেয়েও বেশী শক্তিশালী। এটা আমাদের মূল্যবান সব নীতি এবং আচার-ব্যবহারকে বেশ ঠুনকো ভাবে উপস্থাপন করে”।

ল্যাবরিন্থ একমত হলেন। “তাহলে সম্ভবত রীতি-নীতি এবং মূল্যবোধদের বাঁচাতে কিছুই করা যাবে না”।

“সেটা একমাত্র সময়ই বলে দেবে”, বললাম আমি। “যদিও এই পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু অন্য কোনোটা হয়তো কাজ করবে; এমন কিছু একটা যা আমরা এখন কেন, আরো কিছু দিন বাদেও হয়তো কল্পনা বা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবো না”।

শুভ রাত্রি জানিয়ে আমি গাড়িতে উঠলাম। বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার; রাত পুরোপুরি নেমে গেছে। আমি হেডলাইট জ্বালিয়ে রাস্তা বরাবর এগিয়ে চলতে লাগলাম, নিকষ আঁধারের মাঝ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে। দৃশ্যপটে আর কোনো গাড়ি চোখে পড়লো না। আমি সম্পূর্ণ একা, এবং অত্যন্ত শীতার্ত।

গিয়ার বদলে, গাড়ি ধীর করে আমি একটা মোড়ে এসে থামলাম। আঁধারে আচমকা কিছু একটা নড়ে উঠলো, বিশাল সিকামোর গাছের গোড়ায়। আমি বাইরে ঘাড় বের করলাম, জিনিসটা কী সেটা দেখার আশায়।

সিকামোর গাছের গোড়ায় একটা বিশাল মেটে বর্ণের গুবরে পোকা কিছু একটা বানাচ্ছে। এঁটেল মাটি এনে রাখছে একটা অদ্ভুত, উৎকট কাঠামোর ভিতরে। আমি গুবরে পোকাটাকে একটা সময় পর্যন্ত দেখতে লাগলাম হতবুদ্ধি হয়ে, কৌতূহল নিয়ে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটা আমাকে লক্ষ্য করলো এবং থেমে গেলো। গুবরে পোকাটা তখন আকস্মিকভাবে ঘুরে তার সেই দালানের ভিতরে ঢুকে গেলো, দরজাটা চোয়াল দিয়ে কামড়ে ধরে শক্তভাবে পেছন হতে আটকিয়ে দিয়ে।

আমি গাড়ি চালিয়ে সরে এলাম।

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য “সংরক্ষণকারী যন্ত্র (ফিলিপ কে. ডিকের গল্প)

প্রত্যুত্তর দিন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *