শূন্যস্থান: বাবার না থাকা নিয়ে সাশা সেগানের বক্তব্য

যখন কোনো রেস্টুরেন্টের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়, যখন কোনো চায়ের কাপ ভেঙ্গে যায়, যখন জীবনে কোনো পরিবর্তন ঘটে – তা যত ছোটো পরিবর্তনই হোক না কেন, মা সবসময় একটা কথাই বলে – ” এই কসমসে, পরিবর্তনের হাত থেকে কোনো নিস্তার নেই।”

কোনো কোনো পরিবর্তন বজ্রের মত দ্রুতগতিতে আসে। বাকিগুলোর প্রভাব স্পষ্ট হতে অনেকটুকু সময় লেগে যায়। যখন কোনো নক্ষত্র মারা যায়, সেটার অনুপস্থিতির ঢেউ ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে আলোর গতিতে। আলোর গতি জিনিসটাকে অসম্ভব রকম দ্রুত মনে হয়, কিন্তু মহাশূন্যের ব্যাপক দূরত্বের কথা চিন্তা করলে সেটাও আসলে ততটা গতিময় থাকে না। দূর থেকে মৃত নক্ষত্রকেও উজ্জ্বল দেখা যায়, আসলে ওরা হারিয়ে গেছে সেই কবেই।

আমার জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা এসেছিলো বাবার মৃত্যুর সময়ে। তখন আমার বয়স ১৪। এরপর অনেক বছর আমি স্বপ্নে দেখেছি যে উনি ফিরে এসেছেন এবং এতোদিন কোথায় ছিলেন সেটা নিয়ে বিশাল গল্প ফেঁদে বসেছেন। এরপর ঘুম ভেঙ্গেছে, নিজেকে বিধ্বস্ত অবস্থায় আবিষ্কার করেছি। ওনাকে হারানো, ওনার অনুপস্থিতির সম্পূর্ণ প্রভাব আমার কাছে পৌঁছুতে পৌঁছুতে লেগে গেছে অনেক বছর।

দীর্ঘ রোগে ভুগে উনি মারা যাওয়ার প্রায় ১৬ বছর পর একদিন আমি ম্যানহাটনের একটা হোটেলের লবি-তে বসে ছিলাম। আমার সাথে ছিলো হবু স্বামী, আমাদের বিয়ের পরিকল্পনাকারী, আর ব্যান্ডের মূল গায়িকা।

“বাবা-মেয়ের নাচের অংশটা করবেন না?” ব্যান্ড গায়িকা জিজ্ঞেস করলেন।

নতুন করে পুরনো যন্ত্রণাটা মুচড়ে উঠলো, “না, আমার বাবা মারা গেছেন”, আমি বললাম।

গায়িকা একটু অপ্রস্তুত হলেন। তারপর হেসে বললেন, “এই বিশেষ দিনে আপনার বাবা ঠিকই ওপর থেকে দেখবেন আপনাকে”।

ওনার কথার মধ্যে মমতা মেশানো ছিলো। কিন্তু আমি পরকালে বিশ্বাস করি না। আমার বাবা জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সেগান, ওনার মত আমিও শুধু ততটুকুতেই বিশ্বাস করি, যতটুকু প্রমাণ করা যায়। হবু স্বামী জন আমার হাতে আলতো করে চাপ দিলো। আমি “হুম” টাইপের একটা শব্দ করে আলোচনাটা ঘুরিয়ে দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, অল্প সময়ের মধ্যে কানিয়া ওয়েস্টের হোমকামিং গানটা ওরা শিখে নিতে পারবে কিনা।

প্রত্যেক জন্মদিনে, প্রত্যেক থ্যাংকসগিভিং-এ, প্রতিটি গ্র্যাজুয়েশন, জীবনের প্রতিটি সাফল্য আর ব্যর্থতায় আমি বাবাকে মিস করেছি; প্রতিদিনই মিস করেছি। কিন্তু বিয়ের ব্যাপারটা কেমন যেন একটু আলাদা ছিলো। বিয়ের সময়টা যেন আমার আক্ষেপটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলো। যুক্তিতর্কের উর্ধ্বে গিয়ে, বিয়ের ব্যাপারটা কিভাবে যেন বাবা আর মেয়ের সম্পর্কটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। বাবা নিজের মেয়েকে নিয়ে দুই সারি আসনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যান, প্রথম নাচের সময় বাবাই মেয়েকে নিয়ে আসেন, ভালোবাসার মানুষটির হাতে মেয়ের হাত তুলে দেন।

জন আর আমি একসাথেই বড় হয়েছি, নিউ ইয়র্কের ইথাকা শহরে। অনেক বছর ধরে আমরা একে অপরকে চিনতাম। এরপর বন্ধুত্ব হলো, প্রেম হলো। সম্পর্কের শুরুর দিকে আমরা একটা বন্ধুর বিয়েতে গিয়েছিলাম। ওখানে কনের বাবা বলছিলেন যে তিনি নিজের মেয়েকে কতটা ভালোবাসেন, তাদের দুজনের সম্পর্কটা কত দামী! আমার হৃদয় ভেঙ্গে যাচ্ছিলো, খুব হিংসা হচ্ছিলো। মেয়েদের রেস্টরুমে গিয়ে কেঁদে ফেললাম। ভাবছিলাম, যখন আমার সময় আসবে, তখন বাবাকে ছাড়া বিয়ের রীতিগুলো পালন করা খুব কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়াবে। কেন আমি সবাইকে নিজের জীবনের এই বিশাল শূন্যতাটা দেখার জন্য নেমন্তন্ন জানাবো? সেদিন রাতে, জন আর আমি সেন্ট্রাল পার্কে বসে ছিলাম। সেদিনই প্রথমবারের মত ওকে নিজের কষ্টের গভীরতাটা বুঝতে দিলাম।

জন আমাকে স্বান্তনাদায়ক কোনো মিথ্যে শোনায়নি। ও আমাকে বলেনি যে, সব ঠিক হয়ে যাবে। শুধু আমাকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলো, আর নিজেও কাঁদছিলো। একটা বইতে বাবা লিখেছিলেন, “আমাদের মত এতো ক্ষুদ্র প্রাণীদের জন্য মহাশূন্যের এই বিশালতা সহ্য করার একমাত্র উপায় হলো ভালোবাসা”। জন যখন আমাদের প্রিয় রেস্টুরেন্টে আমাকে ওর স্ত্রী হতে অনুরোধ করলো, তখন ঠিক এজন্যেই, এবং আরো মিলিয়ন অন্যান্য কারণে, আমার মনে কোনো দ্বিধা ছিলো না।

আমার প্রবল ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও, বাবা আমাকে দুই সারি আসনের মধ্য দিয়ে হাত ধরে নিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু আমি জানতাম, বিয়েতে ওনার উপস্থিতি কোনো না কোনোভাবে থাকাটা জরুরি। আমি ঠিক করলাম, আমরা এমন কোথাও বিয়ে করবো যেখানে উনি আর আমি একসাথে গিয়েছিলাম। ওনার আত্মা ওখানে থাকবে, তেমন কোনো বিশ্বাস আমার ছিলো না। তবে হ্যাঁ, ওনার স্মৃতি অবশ্যই সেখানে ছিলো।

এরপর ইথাকা শহরে ফেরার সময়, জন আর আমি কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ধাঁচের একটা ভবন Herbert F. Johnson Museum of Art-এ গেলাম। ছোটোবেলায় বাবা আমাকে ওখানে নিয়ে যেতেন, বিখ্যাত গিয়াকোমেতি ভাস্কর্য (Giacometti sculpture) আর জাপানি পুঁথি দেখাতেন। ১৯৯৬ সালে মারা যাওয়ার পর এখানেই ওনার স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান হয়েছিলো। কিন্তু সেদিন জন আর আমি ওখানে নতুন একটা জিনিস দেখলাম। মিউজিয়ামের অগ্রভাগ থেকে বেরিয়ে আসা বিশাল এবং খোলা এই কক্ষটার সিলিং-এ শিল্পী লিও ভিয়ারিয়েল (Leo Villareal) হাজার হাজার বাতি দিয়ে একটা নকশা করেছেন, যাতে গভীর মহাশূন্যের একটা প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। আমার বাবার সম্মানার্থে, তিনি এই শিল্পটার নাম দিয়েছিলেন “কসমস” – বাবার ভাষায় এটা হলো, “যা কিছু বর্তমান, যা অতীতে ছিলো, এবং ভবিষ্যতে থাকবে।”

সেই বছরের শরতে, মিউজিয়ামের সবার ওপরের তলায় বিছানো দুই সারি আসনের মাঝে দিয়ে, মা আর নানা হাতে ধরে আমাকে নিয়ে হেঁটে গেলেন। ওখান থেকে আমার প্রিয় এই শহরটার পুরোটা দেখা যায়। ককটেইল ড্রিংক আর বক্তৃতা হলো, ব্যান্ড দল গান গাইলো, জন আর আমি ভিয়ারিয়েল-এর সদা পরিবর্তনশীল নক্ষত্ররাজির ছায়াতলে নাচলাম। এরপর বন্ধুবান্ধব আর পরিবারের লোকজন মিলে আমাদেরকে একটা চেয়ারে বসিয়ে ওপরের দিকে আগলে ধরলো। সামনে সুদর্শন এবং চমৎকার সেই লোকটির দিকে তাকালাম, যাকে আমি বিয়ে করেছি। ঠিক ওপরে, আরেক সুদর্শন আর চমৎকার একটা লোকের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের দিকে তাকালাম, যাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। দুই দিকের দৃষ্টি মিলে আমি অনুভব করলাম, আমি সুখী। আমি ভাবিনি, আমি কখনো এতোটা সুখী হবো। এই কসমসে পরিবর্তনের হাত থেকে কোনো নিস্তার নেই। সেই পরিবর্তনগুলোর হাত ধরে আসা হৃদয়ের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার হাত থেকেও পরিত্রাণ নেই। কিন্তু যা কিছু বর্তমান, যা অতীতে ছিলো, এবং ভবিষ্যতে থাকবে – সেগুলোর সবকিছুর মাঝে একটা আলো সর্বদাই জ্বলতে থাকে, আর আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় বহুদূর থেকে।

Original Post:
The Empty Space by Sasha Sagan, Daughter of Carl Sagan

একটি মন্তব্য “শূন্যস্থান: বাবার না থাকা নিয়ে সাশা সেগানের বক্তব্য

প্রত্যুত্তর দিন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না। Required fields are marked *